বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে নারীদের ঐতিহাসিক ভূমিকার ৭০ বছর পরও দক্ষিণ আফ্রিকার নারীরা সহিংসতা, বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও মৌলিক সেবার ঘাটতির মুখে রয়েছে। ১৯৫৬ সালের ৯ আগস্ট প্রায় ২০ হাজার নারী কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের ওপর চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী বৈষম্যমূলক আইন সম্প্রসারণের প্রতিবাদে প্রিটোরিয়ার ইউনিয়ন বিল্ডিংসে মিছিল করেছিলেন। সেই আন্দোলন পরবর্তীতে দেশটির মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে।
১৯৫৬ সালের আন্দোলনের অন্যতম নেতা সোফি উইলিয়ামস-ডি ব্রুইন ৭০ বছর পর ৮৮ বছর বয়সে আবার ইউনিয়ন বিল্ডিংসে ফিরে আসেন। বর্ণবাদের অবসান, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও সংবিধানে সমতার নিশ্চয়তা এলেও তিনি প্রশ্ন তোলেন—অতীতের বিজয় উদ্যাপন করা কতটা সম্ভব, যখন বর্তমান বাস্তবতায় নারীদের জীবন এখনো নিরাপত্তাহীন ও সংকটপূর্ণ।
গণতান্ত্রিক দক্ষিণ আফ্রিকায় নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নারী এখন প্রধান বিচারপতি, পার্লামেন্টের স্পিকার ও পাবলিক প্রটেক্টরের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। তবে প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার মতে, দেশের সম্পদ, জমি ও ব্যবসার মালিকানায় নারীরা এখনো সমান অংশীদার হতে পারেননি।
নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশ ৯ হাজার ৭৮২টি ধর্ষণের অভিযোগ এবং ১২ হাজার ৫৯০টি যৌন অপরাধ নথিভুক্ত করেছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০৮টি ধর্ষণের অভিযোগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৭ শতাংশের বেশি ঘটনা ভুক্তভোগী বা অভিযুক্তের বাড়িতে ঘটেছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দক্ষিণ আফ্রিকার কর্মীরা জানিয়েছেন, অনেক নারী পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে গিয়ে অবহেলা, তথ্যের অভাব ও দীর্ঘসূত্রতার মুখোমুখি হন। ফলে অনেকে শেষ পর্যন্ত মামলা চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। গত বছর দেশটির সরকার লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও নারীনিধনকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করলেও অধিকারকর্মীরা বলছেন, শুধু ঘোষণা দিয়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও নারীরা পুরুষদের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছেন। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে দক্ষিণ আফ্রিকার সামগ্রিক বেকারত্বের হার ছিল ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ। নারীদের ক্ষেত্রে তা ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ এবং কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান নারীদের ক্ষেত্রে ৪০ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণও পুরুষদের তুলনায় কম।
তরুণ নারীদের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৩৯ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষা, প্রশিক্ষণ বা কর্মসংস্থানের বাইরে রয়েছে। বেকারত্ব নারীদের অর্থনৈতিকভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে এবং নির্যাতনমূলক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সক্ষমতাও কমিয়ে দেয়।
বর্ণবাদী শাসনের অবসান রাজনৈতিক বৈষম্য দূর করলেও কয়েক দশকের অর্থনৈতিক বঞ্চনা পুরোপুরি কাটেনি। জমি, পুঁজি, কর্মসংস্থান ও সরকারি সেবায় বৈষম্যের প্রভাব বিশেষ করে দরিদ্র ও গ্রামীণ নারীদের ওপর এখনো রয়েছে।
জাতীয় নারী দিবসের ৭০ বছর পূর্তিতে তাই দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে বড় প্রশ্ন হলো—রাজনৈতিক স্বাধীনতা কি সাধারণ নারীদের দৈনন্দিন জীবনে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তরিত হয়েছে? ঐতিহাসিক আন্দোলনের নেতাদের মতে, সহিংসতা, বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও দুর্বল জনসেবা অব্যাহত থাকলে সেই সংগ্রামের পূর্ণ সাফল্য এখনো অর্জিত হয়নি।
















