কাশ্মীর সংকট এখনো ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বড় ধরনের উত্তেজনার কারণ হয়ে রয়েছে। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কাশ্মীরকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিরোধ শুধু সামরিক শক্তি বা পুরোনো রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। স্থায়ী শান্তির জন্য স্থানীয় জনগণের রাজনৈতিক অধিকার, নিরাপত্তা, প্রতিনিধিত্ব এবং স্বাধীন মতামত নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে পাহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হয়। কয়েক দিনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর যুদ্ধবিরতি হলেও দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। উভয় দেশই পারমাণবিক অস্ত্রধারী হওয়ায় কাশ্মীরের যেকোনো বড় সংঘাত আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি বৈশ্বিক ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
এই সংকটের প্রভাব শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পাহেলগাম হামলার পর ভারত সিন্ধু নদের পানি বণ্টন চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কয়েকটি যুদ্ধের পরও টিকে থাকা এই চুক্তির স্থগিত হওয়া দেখিয়েছে যে কাশ্মীর বিরোধ এখনো দুই দেশের অন্যান্য সম্পর্কেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
কাশ্মীরের বর্তমান সংকটের শিকড় ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময়কার ঘটনাপ্রবাহে। সে সময় পাকিস্তান থেকে সশস্ত্র যোদ্ধারা কাশ্মীরে প্রবেশ করলে তৎকালীন মহারাজা ভারতের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত নেন। পরে জাতিসংঘের প্রস্তাবে পাকিস্তানের সেনা প্রত্যাহার, ভারতের সেনা কমানো এবং জনগণের মতামত যাচাইয়ের কথা বলা হলেও সেই প্রক্রিয়া আর বাস্তবায়িত হয়নি। এরপর থেকে দুই দেশের পারস্পরিক অভিযোগ ও অবিশ্বাস সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
২০১৯ সালে ভারত কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বাতিল করে অঞ্চলটিকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করে। ২০২৪ সালে সেখানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা এখনো ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। বিশ্লেষকের মতে, নির্বাচিত বিধানসভা থাকলেও রাজ্যের মর্যাদা না থাকা কাশ্মীরের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সীমিত করে রেখেছে।
অন্যদিকে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম কাশ্মীর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে দুই দেশের কোনো সরকারই কাশ্মীরিদের নিজস্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত সমাধানের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেনি।
কাশ্মীরি পণ্ডিতসহ বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর অধিকারও এই সংকটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে বিশ্লেষণে তুলে ধরা হয়েছে। সহিংসতার কারণে উপত্যকা থেকে বহু পরিবার চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন, ক্ষতিপূরণ, সম্পত্তির অধিকার এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না করে কোনো গণভোট বা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া গ্রহণ করলে তা পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করবে না বলে মত দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মতামত দিয়ে কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা উচিত নয়। মুসলিম, হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈনসহ সব সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। যারা সহিংসতার কারণে অঞ্চল ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে, তাদেরও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
একই সঙ্গে এখনই গণভোট আয়োজনের বিরুদ্ধেও সতর্ক করা হয়েছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীর হুমকি, বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী, সামরিক উপস্থিতি ও ধর্মীয় বিভাজনের মধ্যে ভোট হলে তা প্রকৃত জনমত প্রকাশের পরিবর্তে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে। তাই প্রথমে রাজনৈতিক স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার এবং অবাধ রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকের মতে, ভারতকে কাশ্মীরের রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দিয়ে রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন ও নাগরিক স্বাধীনতা শক্তিশালী করতে হবে। পাকিস্তানকে সীমান্তপারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন বন্ধ করে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে রাজনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণরেখা দিয়ে বাণিজ্য ও পারিবারিক যোগাযোগ পুনরায় চালুর মাধ্যমে দুই পাশের জনগণের যোগাযোগ বাড়ানো যেতে পারে।
কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নিয়ে একক কোনো সিদ্ধান্তের পরিবর্তে অঞ্চলভেদে জনগণের মতামত বিবেচনার কথাও বিশ্লেষণে বলা হয়েছে। জম্মু, কাশ্মীর উপত্যকা ও লাদাখের মানুষের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও আকাঙ্ক্ষা এক নয়। তাই আঞ্চলিক বৈচিত্র্যকে বিবেচনায় নিয়ে স্বায়ত্তশাসন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা, সীমান্তপারের সহযোগিতা কিংবা স্বাধীনতার মতো বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে জনগণের মতামত নেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
বিশ্লেষণে উত্তর আয়ারল্যান্ড, দক্ষিণ তিরোল ও ওহরিদ চুক্তির উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন পক্ষকে রাজনৈতিক বিকল্প ও স্বায়ত্তশাসনের সুযোগ দিলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত কমানো সম্ভব হতে পারে। এসব মডেল সরাসরি কাশ্মীরে প্রয়োগ করা সম্ভব না হলেও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সমাধানের গুরুত্ব বোঝাতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের কোনো নির্দিষ্ট পতাকা বা রাজনৈতিক অবস্থান চাপিয়ে না দিয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি, মানবাধিকার নিশ্চিত করা, বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবর্তনে সহায়তা এবং ভারত ও পাকিস্তানের ওপর সশস্ত্র সহিংসতা বন্ধে চাপ প্রয়োগ করা উচিত।
বিশ্লেষকের মতে, ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশেই জাতীয়তাবাদ, নিরাপত্তা ও সীমান্ত বিরোধকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার প্রবণতা রয়েছে। এর ফলে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘদিন আড়ালে পড়ে গেছে। সামরিক নিয়ন্ত্রণ সাময়িকভাবে শান্তি আনতে পারে, কিন্তু স্থায়ী শান্তির জন্য জনগণের সম্মতি প্রয়োজন।
কাশ্মীরের সংকট তাই শুধু ভারত ও পাকিস্তানের ভূখণ্ডগত বিরোধ নয়; এটি রাজনৈতিক অধিকার, নিরাপত্তা, বাস্তুচ্যুতি, আন্তঃসম্প্রদায়িক আস্থা এবং জনগণের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্ন। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি যতই স্থায়ী হোক, জনগণের রাজনৈতিক অধিকার ও মতামত নিশ্চিত না হলে কাশ্মীরের শান্তি কেবল একটি সাময়িক সামরিক বিরতি হয়েই থাকবে।
















