স্কটল্যান্ডের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত একটি সংক্ষিপ্ত উপকূলীয় পথ এখন ইতিহাস, বিজ্ঞান ও প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। প্রায় এক মাইল দীর্ঘ এই পথটি দর্শনার্থীদের এমন এক শিলাস্তরের কাছে নিয়ে যায়, যেখানে তিন শতাব্দী আগে এক বিজ্ঞানীর যুগান্তকারী আবিষ্কার পৃথিবীর বয়স সম্পর্কে মানুষের প্রচলিত ধারণা আমূল বদলে দিয়েছিল।
এই পথটি তৈরি করা হয়েছে ভূতত্ত্ববিদ জেমস হাটনের জন্মের তিনশ বছর পূর্তি উপলক্ষে। তিনি পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন, পৃথিবীর ভূপ্রকৃতি দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষয়, সঞ্চয় ও পরিবর্তনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় গড়ে উঠেছে। সেই ধারণার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ তিনি খুঁজে পান স্কটল্যান্ডের এই উপকূলীয় শিলাস্তরে।
এখানে দেখা যায়, বহু প্রাচীন খাড়া শিলার ওপর অপেক্ষাকৃত নবীন সমতল বেলেপাথরের স্তর জমেছে। এই অস্বাভাবিক গঠন থেকেই তিনি উপলব্ধি করেন, পৃথিবীর ইতিহাস মানুষের কল্পনার চেয়ে অনেক বেশি দীর্ঘ। পরবর্তীতে এই ধারণাই ‘গভীর সময়’ নামে বৈজ্ঞানিক জগতে পরিচিতি পায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আবিষ্কার শুধু ভূতত্ত্বের নয়, জীববিবর্তনসহ আধুনিক বিজ্ঞানের বহু তত্ত্বের ভিত্তি শক্তিশালী করেছে। কারণ পৃথিবীর ইতিহাস যদি কোটি কোটি বছরের না হতো, তাহলে জীববিবর্তনের মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ব্যাখ্যাও সম্ভব হতো না।
উপকূলীয় পথজুড়ে বিভিন্ন তথ্যফলক, পাথরে খোদাই করা উদ্ধৃতি এবং শব্দভিত্তিক নির্দেশনার মাধ্যমে দর্শনার্থীরা জেমস হাটনের জীবন, গবেষণা এবং তাঁর বৈপ্লবিক চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। একই সঙ্গে পথের দুই পাশে বিস্তৃত সবুজ পাহাড়, খাড়া উপকূল, নির্জন সৈকত ও উত্তর সাগরের মনোরম দৃশ্য ভ্রমণকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, আঠারো শতকে জেমস হাটন নৌপথে এই স্থানে এসে শিলাস্তরগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। পরে তাঁর সহযাত্রীরাও এই দৃশ্য দেখে বিস্মিত হন এবং পৃথিবীর ইতিহাস যে কল্পনার চেয়েও অনেক দীর্ঘ হতে পারে, সেই উপলব্ধির কথা লিপিবদ্ধ করেন।
বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণায় জানা গেছে, নিচের গাঢ় রঙের শিলাগুলো প্রায় ৪৩ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে একটি প্রাচীন সমুদ্রের তলদেশে সৃষ্টি হয়েছিল। পরে ভূত্বকের পরিবর্তনে সেগুলো ওপরে উঠে আসে। তারও প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর পর ওপরের বেলেপাথরের স্তর গঠিত হয়।
গবেষকরা বলছেন, বিশ্বের ভূতত্ত্ববিদদের কাছে এই স্থান বহুদিন ধরেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সাধারণ পর্যটকদের কাছে তা তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত। নতুন এই উপকূলীয় পথের মাধ্যমে আরও বেশি মানুষ পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাস ও প্রকৃতির বিস্ময়কর পরিবর্তনের গল্প জানার সুযোগ পাবেন।
















