সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ শুধু জনস্বাস্থ্য নয়, মানুষের চিন্তাভাবনা, সামাজিক আচরণ এবং অন্যদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতেও সূক্ষ্ম পরিবর্তন আনতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের মস্তিষ্কে থাকা একটি স্বাভাবিক প্রতিরক্ষামূলক মানসিক ব্যবস্থা সংক্রমণের আশঙ্কা দেখা দিলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলে।
গবেষকদের ভাষায়, এই মানসিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মানুষকে সম্ভাব্য সংক্রমণ থেকে দূরে থাকতে সহায়তা করে। ফলে রোগের খবর বা সংক্রমণের ইঙ্গিত পেলেই মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি সতর্ক, নিয়মমুখী এবং ঝুঁকি এড়াতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে সামাজিক নিয়ম ভঙ্গকারীদের প্রতি কঠোর মনোভাব এবং অপরিচিত বা ভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষের প্রতি সন্দেহও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বিপুল শক্তি ব্যয় করে। তাই বিবর্তনের ধারায় এমন একটি মানসিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি আগেই এড়ানোর চেষ্টা করে। দুর্গন্ধযুক্ত বা পচা খাবারের প্রতি স্বাভাবিক ঘৃণা তারই একটি উদাহরণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, অসুস্থতার স্মৃতি মনে করিয়ে দিলে বা সংক্রমণের দৃশ্য দেখানোর পর মানুষ দলগত মতামতের সঙ্গে সহজে একমত হতে শুরু করে। তারা নিজের স্বাধীন মতের পরিবর্তে প্রচলিত মতামত অনুসরণে বেশি আগ্রহী হয়।
আরও কিছু গবেষণায় দেখা যায়, সংক্রমণের আশঙ্কা মানুষের নৈতিক মূল্যায়নেও প্রভাব ফেলে। একই পরিস্থিতিতে তারা অন্যের আচরণকে তুলনামূলকভাবে বেশি কঠোরভাবে বিচার করতে পারে। গবেষকদের মতে, অতীতে মহামারির সময় সমাজে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
এছাড়া বিভিন্ন দেশের গবেষণায় দেখা গেছে, সংক্রামক রোগের ভয় বেড়ে গেলে কিছু মানুষের মধ্যে বিদেশি বা ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি অবিশ্বাসও বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মানুষের বিবর্তনগত প্রতিরক্ষামূলক প্রবণতার অংশ হলেও আধুনিক সমাজে তা সামাজিক বিভাজন ও বৈষম্যের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সাম্প্রতিক মহামারির সময় পরিচালিত একাধিক জরিপেও দেখা গেছে, সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ এবং সংখ্যালঘু বা অভিবাসীদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাবের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, বাস্তব জীবনে মানুষের আচরণ শুধু রোগভীতি দ্বারা নির্ধারিত হয় না; শিক্ষা, পারিবারিক পরিবেশ, ব্যক্তিত্ব, সামাজিক অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রামক রোগ নিয়ে সংবাদ পড়ার সময় মানুষের উচিত সচেতন থাকা যে এমন খবর তার বিচার-বিশ্লেষণ ও অন্যদের সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিতে অজান্তেই প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এই প্রভাব সবার ক্ষেত্রে একরকম নয় এবং ব্যক্তিভেদে এর মাত্রা ভিন্ন হতে পারে।
















