দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সুদের হার বাড়িয়েছে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির নীতিনির্ধারকেরা।
মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার নীতিগত সুদের হার ০.৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশে উন্নীত করেছে। ১৯৯৫ সালের পর এটিই জাপানের সর্বোচ্চ সুদের হার।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরানকে ঘিরে সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যায়। এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়ানোর পথে হাঁটছে এবং জাপানও সেই ধারায় নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে।
জাপানে ১৯৯০-এর দশকে সম্পদবাজার ধসের পর অর্থনীতি দীর্ঘ সময় ধরে স্থবির অবস্থায় ছিল। মূল্যস্ফীতি কমে যাওয়ায় এবং প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়ে পড়ায় সুদের হার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি রাখা হয়েছিল। টানা দুই দশকের বেশি সময় ধরে দেশটি অত্যন্ত নিম্ন সুদের নীতিতে পরিচালিত হয়েছে।
তবে ২০২৪ সালের মার্চে দীর্ঘ ১৭ বছর পর প্রথমবারের মতো সুদের হার বৃদ্ধি শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপর ধাপে ধাপে হার বাড়ানো হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিনের মূল্যপতনের যুগ পেরিয়ে এখন জাপান মূল্যস্ফীতির নতুন চক্রে প্রবেশ করেছে। ফলে জরুরি অর্থনৈতিক সহায়তার জন্য গৃহীত আগের নীতিগুলোর প্রয়োজনীয়তা কমে এসেছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক মুদ্রানীতিতে ফিরতে চায়।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপ বাড়ছিল। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপক নির্ভরশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি জাপানের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে দেশটির পাইকারি মূল্য এক বছর আগের তুলনায় ৬ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি। তবে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হার এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার নিচে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে একটি জটিল ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে সুদের হার বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়তা করতে পারে, অন্যদিকে ঋণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর কাজুও উয়েদা বর্তমানে চিকিৎসাধীন থাকায় সাম্প্রতিক বৈঠকে উপস্থিত থাকতে পারেননি। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তিনি এবং অন্যান্য নীতিনির্ধারকেরা সুদের হার বৃদ্ধির বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান প্রকাশ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি অতীতে সুদের হার বাড়ানোর বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তিনি রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন। তবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য সমালোচনা করেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, সুদের হার বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো জাতীয় মুদ্রার মান স্থিতিশীল রাখা। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডলার ও ইউরোর বিপরীতে জাপানি মুদ্রা চাপের মুখে ছিল।
তবে সর্বশেষ বৃদ্ধির পরও জাপানের সুদের হার বিশ্বের অনেক বড় অর্থনীতির তুলনায় কম রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে বর্তমানে সুদের হার ৩ শতাংশেরও বেশি।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, জাপানের এই সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যে ধীরগতির একটি নতুন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে, যেখানে দীর্ঘদিনের অতিনিম্ন সুদের নীতি থেকে দেশটি ধীরে ধীরে সরে আসছে।
















