প্রায় চার মাসের সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (Memorandum of Understanding) চূড়ান্ত হয়েছে। তবে এই ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে স্বস্তি ফিরলেও ইরানের রাজধানী তেহরানের অনেক বাসিন্দা এখনো নিশ্চিত নন যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি সত্যিই প্রতিষ্ঠিত হবে।
আগামী শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা থাকা এই চুক্তির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার কথা জানিয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বহু প্রশ্ন এখনো অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিয়ম—এসব বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি।
তেহরানের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী পারিসা বলেন, “আমি মনে করি না এই চুক্তি সাধারণ মানুষের জীবনে খুব বড় পরিবর্তন আনবে। হয়তো কিছুদিন কার্যকর থাকবে, কিন্তু উভয় পক্ষই নিজেদের স্বার্থে একসময় এটি ভঙ্গ করবে।”
আরেক বাসিন্দা মেহদি মনে করেন, ইরানের প্রধান দাবিগুলো মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ সীমিত। তাঁর ভাষায়, “আমি আশাবাদী নই। এখনো অনেক জটিল বিষয় অমীমাংসিত রয়েছে।”
ইরানের সাধারণ মানুষের বড় প্রত্যাশা হলো কঠোর মার্কিন ও জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। দীর্ঘদিনের এই নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
চুক্তির বিরোধিতাও রয়েছে দেশের ভেতরে। কট্টরপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো মনে করে, আলোচনায় ইরান অতিরিক্ত ছাড় দিতে পারে। তারা আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার পক্ষে।
এদিকে, দেশজুড়ে আয়োজিত সরকারপন্থী সমাবেশগুলোতে অনেক অংশগ্রহণকারী যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন। তাঁদের দাবি, অতীত অভিজ্ঞতা অনুযায়ী ওয়াশিংটন ভবিষ্যতেও চুক্তি লঙ্ঘন করতে পারে।
তেহরানের এক সরকারসমর্থক নারী মোহাদেসে বলেন, “আমার মনে হয় না এই চুক্তি টিকবে। যুক্তরাষ্ট্র আবারও এটি ভঙ্গ করবে। তাই ইরানের উচিত নিজের শক্ত অবস্থান বজায় রাখা।”
অন্যদিকে অর্থনৈতিক বাজারগুলো ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা এবং অবরোধ শিথিল হওয়ার খবরের পর ইরানের মুদ্রার মান কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। স্বর্ণের দামও কমেছে এবং তেহরান স্টক এক্সচেঞ্জ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
সরকারি গণমাধ্যম চুক্তিটিকে ইরানের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত সংঘাত বন্ধে সমঝোতায় আসতে বাধ্য হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃত ফলাফল নির্ভর করবে আগামী কয়েক মাসের আলোচনার ওপর। পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে সমাধান না হলে বর্তমান সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারবে না।
ফলে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও তেহরানের রাস্তায় স্বস্তির পাশাপাশি অনিশ্চয়তা ও সংশয়ই এখন সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে।
















