আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের মানচিত্রে বাংলাদেশের জন্য তৈরি হতে যাচ্ছে এক ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন সুযোগ। মধ্যপ্রাচ্য ও প্রচলিত শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এবার রাশিয়ার বিশাল শ্রমবাজারে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। বর্তমানে রাশিয়ায় কর্মরত ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যাকে আগামী মাত্র এক বছরের মধ্যে ১ লাখে উন্নীত করার এক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে ইতোমধ্যে নীতিগত সম্মতি জানিয়েছে রুশ কর্তৃপক্ষ। মস্কো সফররত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বিশেষ কূটনৈতিক তৎপরতা দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মস্কোয় কূটনৈতিক বৈঠক ও জনশক্তির নতুন লক্ষ্য:
মঙ্গলবার (৯ জুন) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। তিন দিনের সরকারি সফরে বর্তমানে রাশিয়ায় অবস্থান করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তার এই গুরুত্বপূর্ণ সফরে সঙ্গে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। মস্কোয় অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানি বর্তমানের ১০ হাজার থেকে বাড়িয়ে আগামী বছরের মধ্যে ১ লাখে উন্নীত করার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেন। রুশ কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের এই প্রস্তাবকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে এবং দ্রুত এ বিষয়ে কাজ করার সম্মতি জানিয়েছে। উভয় পক্ষই শিগগিরই এই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবে।
তৈরি পোশাক ও ওষুধের বাজারে নতুন সম্ভাবনা:
উচ্চপর্যায়ের এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে কেবল জনশক্তি রপ্তানিই নয়, দুই দেশের মধ্যকার সামগ্রিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক লেনদেন বাড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাশিয়ার বিশাল বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (RMG) এবং আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ রপ্তানির বিপুল সম্ভাবনার কথা রুশ প্রতিনিধিদের সামনে তুলে ধরেন। বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও ওষুধের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা গেলে তা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে এক নতুন বৈচিত্র্য ও গতি এনে দেবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও প্রযুক্তি খাতে অংশীদারিত্ব:
এই সফরের সবচেয়ে আধুনিক ও তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো তথ্যপ্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তিতে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা। বর্তমান যুগে প্রযুক্তির উৎকর্ষতাকে কাজে লাগাতে কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতের মতো মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাস্তব প্রয়োগ এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বিষয়ে সহযোগিতা আরও বেগবান করতে রাশিয়ার একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল দ্রুতই বাংলাদেশ সফরে আসবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে, মস্কোর এই সফর কেবল শ্রমিক পাঠানোর কোনো প্রথাগত চুক্তি নয়, বরং তা বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আধুনিক প্রযুক্তিগত সম্পর্কের এক নতুন সমীকরণ। বৈশ্বিক রাজনীতির টেবিলে সমীকরণ যতই পরিবর্তন হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের এই অর্থনৈতিক সার্থকতা এবং কূটনৈতিক দূরদর্শিতাই দেশের ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের সুরক্ষায় বড় ভূমিকা রাখবে।
















