মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক চলাচল ব্যাহত হওয়ার ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতি নতুন চাপের মুখে পড়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং সামুদ্রিক সার বাণিজ্যের বড় অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জাহাজ পরিবহন ব্যয় বেড়েছে এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উঠে এসেছে চীন। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি নয়, বরং উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে দেশটি।
চীনের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে তার বিস্তৃত শিল্পভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা। কাঁচামাল থেকে চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদন পর্যন্ত বিস্তৃত এই কাঠামো আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যপথে বাধা সৃষ্টি হলেও চীন অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতার মাধ্যমে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সক্ষম হয়েছে।
একই সঙ্গে বিভিন্ন খাতে উৎপাদন বৃদ্ধি করে আন্তর্জাতিক বাজারের ঘাটতি পূরণেও ভূমিকা রাখছে দেশটি। বিশেষ করে শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন সম্প্রসারণ বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থাকে সচল রাখতে সহায়তা করছে।
জ্বালানি সংকটের মধ্যেও উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হওয়ায় আন্তর্জাতিক উৎপাদন খাতে চীনের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। উন্নত প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে দেশটি বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্ব ধরে রেখেছে।
বিশেষ করে বৈদ্যুতিক যানবাহন, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি এবং সৌরশক্তি খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর বৈশ্বিক প্রচেষ্টায়ও চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
আর্থিক খাতেও দেশটির প্রভাব বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে তুলনামূলক স্থিতিশীল বাজার হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চীনা মুদ্রার ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় এর গুরুত্বও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক লেনদেনে বিকল্প মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগ সম্প্রসারণ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তা তৈরি করছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুদ্রা বিনিময় চুক্তি এবং ঋণপত্রভিত্তিক অর্থায়ন ব্যবস্থাও চীনের আর্থিক প্রভাব বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে, স্থলভিত্তিক আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পগুলোও নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় ইউরেশীয় স্থলপথে পণ্য পরিবহন বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে আন্তঃদেশীয় রেল ও স্থল যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার সময়ে উৎপাদন, জ্বালানি, বাণিজ্য ও আর্থিক খাতে চীনের সক্ষমতা বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধরনের ধাক্কা থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করছে। এ কারণে দেশটির অর্থনৈতিক অবদান এখন শুধু জাতীয় উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে।
















