ক্ষুধায় জর্জরিত সুদানে আবারও বয়ে গেছে যুদ্ধের ঝড়। দারফুর থেকে শুরু হওয়া সংঘাত এবার ছড়িয়ে পড়ছে পূর্ব দিকে। আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস বা আরএসএফ-এর হামলার মুখে হাজার হাজার মানুষ নতুন করে তাদের ভিটেমাটি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, এই অব্যাহত সহিংসতা মানবিক বিপর্যয়কে আরও গভীর করে তুলছে।
গত সপ্তাহে উত্তর দারফুরের রাজধানী এল-ফাশার দখলে নেয় আরএসএফ। এরপর থেকেই শহরজুড়ে শুরু হয় হত্যাযজ্ঞ, লুটপাট আর ধ্বংসযজ্ঞ। জাতিসংঘের হিসাবে, এক সপ্তাহের মধ্যে ৭০ হাজারের বেশি মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছে। এল-ফাশার দখলের পর আরএসএফ এখন মধ্য সুদানের উত্তর কুরদোফানের রাজধানী এল-ওবেইদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তারা ঘোষণা দিয়েছে, ‘শিগগিরই শহর মুক্ত করা হবে’।
জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা আইওএম জানিয়েছে, গত শুক্রবারই শুধু বারাহ ও উম রাওয়াবা এলাকা থেকে ১২০০ জন মানুষ পালিয়ে গেছে। গত সপ্তাহে উত্তর কুরদোফানেই গৃহহীন হয়েছে প্রায় ৩৭ হাজার মানুষ। দক্ষিণ কুরদোফানে আরও শত শত পরিবার আশ্রয়ের খোঁজে ভেসে বেড়াচ্ছে।
জাতিসংঘের তথ্য বলছে, এল-ফাশারে আরএসএফের দখলের পর থেকে শহরে আটকা পড়েছে হাজার হাজার ক্ষুধার্ত ও ভীত মানুষ। রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মৃতদেহ, শহরজুড়ে শোক আর আতঙ্কের ছায়া। অনেকে পরিবার হারিয়েছে, কেউ নিজের চোখে দেখেছে প্রিয়জনের মৃত্যু। শিশু, নারী, বৃদ্ধ—কেউই রেহাই পাচ্ছে না।
সোমবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জাতিসংঘের খাদ্য নিরাপত্তা সংস্থা আইপিসি জানিয়েছে, এল-ফাশার ও দক্ষিণ কুরদোফানের কাদুগলি অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। দারফুর ও কুরদোফানের আরও ২০টি এলাকায় একই ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। সংস্থার হিসাবে, প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ ইতিমধ্যেই দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতিতে বাস করছে, আর ছয় মিলিয়নের বেশি মানুষ মারাত্মক ক্ষুধার্ত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ঘোষণা করেছে, এল-ফাশারে আরএসএফের বর্বরতার ঘটনাগুলো এখন যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে তদন্তাধীন। আদালত জানিয়েছে, তারা প্রমাণ সংগ্রহে জরুরি পদক্ষেপ নিচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা যায়।
মানুষের চোখে এখন শুধু ধ্বংস, কান্না আর ক্ষুধার ছায়া। এক পিতা ইয়াহইয়া আবদুল্লাহ, যিনি এল-ফাশার থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়েছেন, বলেন, “রাস্তা ভরে ছিল লাশে। তারা শিশুদের দিকেও গুলি চালিয়েছে। আমি শুনেছি এক সৈন্য চিৎকার করে বলছিল, সবাইকে মেরে ফেলো।”
যুদ্ধের অন্ধকারে ডুবে থাকা এই দেশটি এখন এক বিশাল মানবিক কবরস্থানে রূপ নিচ্ছে—যেখানে ক্ষুধা, মৃত্যু আর নির্বাক কান্নাই একমাত্র ভাষা।
















