শেরপুর সদর উপজেলার খুনুয়া চরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা অশীতিপর বৃদ্ধ সাজু শেখ ও তার স্ত্রী নূরজাহান বেগম। তাদের দীর্ঘ ৭০ বছরের দাম্পত্য জীবনে কখনোই সুখের দেখা মেলেনি। যৌবনে কাঁচামালের ব্যবসা করে কোনোমতে সংসার চালালেও জীবনের শেষ প্রান্তে এসে চরম অভাব আর অনাহারে তাদের দিন কাটছে। এত কষ্ট ও অভাবের মধ্যেও এই দম্পতির একে অপরের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার কোনো ঘাটতি নেই, যা সম্প্রতি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওর মাধ্যমে সবার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।
স্থানীয়দের সূত্রে জানা গেছে, সাজু-নূরজাহান দম্পতির সংসারে তিন মেয়ে ও তিন ছেলে রয়েছে। অনেক আগেই তিন মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, তবে তারা খুব কালেভদ্রে বাবা-মায়ের খোঁজখবর নেন। অন্যদিকে, তিন ছেলের মধ্যে একজন করোনার সময় নিখোঁজ হলেও মাঝে মাঝে পরিবারের খবর নেন। আরেক ছেলে ঢাকায় রিকশা চালান এবং বছরে মাত্র দু-একবার বাড়ি আসেন। মূলত তাদের সব সন্তানই নিজেদের জীবনে তীব্র দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছেন।
শেরপুরেই বসবাসকারী তাদের আরেক ছেলে নূর ইসলাম দিনমজুরি ও ঠেলাগাড়ি চালিয়ে সাধ্যমতো বাবা-মায়ের দেখাশোনা করার চেষ্টা করেন। তবে তার নিজের সংসারেই অভাব লেগেই থাকে। কয়েক বছর আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় তার স্ত্রীর মৃত্যু হয়। এ কারণে প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তিনি বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পর্যাপ্ত ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে পারেন না।
দুর্ভোগের মাত্রা আরও বাড়ে প্রায় ছয় বছর আগে। সেসময় পা পিছলে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে যায় স্ত্রী নূরজাহানের। এরপর থেকে তিনি পুরোপুরি শয্যাশায়ী। চরম অর্থাভাবে স্ত্রীর কোনো চিকিৎসাও করাতে পারছেন না স্বামী সাজু শেখ। এর মধ্যেই গত ৯ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের একটি হৃদয়বিদারক ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, ঘরের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে অসুস্থ স্ত্রীকে কোলে নিয়ে খাবারের জন্য আর্তনাদ করছেন এই বৃদ্ধ। কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আল্লাহ আমাকে খাবার দাও, আমার স্ত্রীকে নিয়ে আমি খুব কষ্টে আছি।’
জানা যায়, তাদের এই করুণ আকুতি শুনে স্থানীয় এক ব্যক্তি ভিডিওটি ধারণ করে ফেসবুকে আপলোড করেন, যা মুহূর্তের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যায়। সমাজকর্মী শামীম আহমেদ এ প্রসঙ্গে জানান, জীবনযুদ্ধে মানুষ অনেক সময় দারিদ্র্যের কাছে পরাজিত হয়। ৮০ বছর বয়সী এই দম্পতির শারীরিক অক্ষমতা, রোগবালাই ও চরম দারিদ্র্য যেন তাদের এই পারস্পরিক ভালোবাসার কাছেই হার মেনেছে।
ভিডিওটি দেখে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে। ‘রক্তসৈনিক বাংলাদেশ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আল আমিন রাজু জানান, বিষয়টি নজরে আসার পরই তারা দ্রুত খোঁজ নিয়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে এই দম্পতির হাতে দেড় মাসের প্রয়োজনীয় খাবার তুলে দিয়েছেন। ‘সৃষ্টি হিউম্যান রাইটস সোসাইটি’র শেরপুর জেলা সভাপতি আলমগীর আল আমিন বলেন, তাদের কাছে এখন খাবারের মোটামুটি মজুত থাকলেও উন্নত চিকিৎসার ভীষণ প্রয়োজন, কারণ তারা দুজনেই বয়সের ভারে নানা রোগে জরাজীর্ণ।
এদিকে, শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন জানিয়েছেন, ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি তাদের নজরে এসেছে। বৃদ্ধ সাজু শেখ ও নূরজাহান দম্পতির বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজখবর নিয়ে সরকারিভাবে যেসব নাগরিক সুবিধা দেওয়া সম্ভব, তা দ্রুত নিশ্চিত করা হবে।
তথ্যসূত্র- জাগো নিউজ






















