উত্তর কোরিয়ার প্রাক্তন আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধান ও কিম পরিবারের প্রতি অগাধ অনুরাগী কিম ইয়ং নাম পরলোকগমন করেছেন। মঙ্গলবার দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কেসিএনএ জানায়, ৯৭ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ রাজনীতিক সোমবার ক্যানসারজনিত জটিলতায় বহু অঙ্গ বিকল হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
কিম ইয়ং নাম ছিলেন উত্তর কোরিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত কিংবদন্তি। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি দেশের সংসদ—সুপ্রিম পিপলস অ্যাসেম্বলির নেতৃত্ব দিয়েছেন, একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
সংবাদ সংস্থার ভাষায়, “সহযোদ্ধা কিম ইয়ং নাম, আমাদের দলের ও দেশের ইতিহাসে অসাধারণ অবদান রাখা এক প্রজন্মের বিপ্লবী, ৯৭ বছর বয়সে তাঁর গৌরবময় জীবন পরিসমাপ্ত করলেন।”
মঙ্গলবার সকালে কিম ইয়ং নামের প্রয়াণে গভীর শোক জানাতে তাঁর মরদেহের পাশে উপস্থিত হন উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন। বৃহস্পতিবার তাঁর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠিত হবে বলে জানা গেছে।
গম্ভীর কণ্ঠে প্রচারভিত্তিক বক্তৃতা, আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি আর রাজকীয় শিষ্টাচারে কিম ইয়ং নাম ছিলেন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের অবিচ্ছেদ্য মুখ। কিম জং উন ও তাঁর প্রয়াত পিতা কিম জং ইলের পক্ষ থেকে বিদেশি প্রতিনিধিদের স্বাগত জানাতে তাঁকে প্রায়ই দেখা যেত রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের পর্দায়।
যদিও নামের মিল থাকলেও তিনি কিম জং উনের আত্মীয় নন। দেশের প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল সুং-এর নাতি কিম জং উন ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পরও, কিম ইয়ং নাম তাঁর প্রতি নিবেদিত ছিলেন পুরোদমে।
১৯৯৮ সাল থেকে ২০১৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি সুপ্রিম পিপলস অ্যাসেম্বলির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে এই পদধারীকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে গণ্য করা হলেও, প্রকৃত ক্ষমতা সবসময়ই কিম পরিবারেই কেন্দ্রীভূত থেকেছে।
১৯৯৪ সালে কিম ইল সুংয়ের মৃত্যুর পর তিনি রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠাতার প্রতি শোকগাথা পাঠ করেন। তিনিই পরে কিম জং ইলকে ন্যাশনাল ডিফেন্স কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনয়ন দেন, পিতার তিন বছরের শোককাল শেষে পুত্রের হাতে ক্ষমতা অর্পণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন।
২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জংকে সঙ্গে নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার পিয়ংচ্যাং অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সেই সফরেই তিনি দক্ষিণ কোরিয়ায় সফরকারী সর্বোচ্চ পর্যায়ের উত্তর কোরীয় কর্মকর্তা হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন।
তবে বয়সের ভারে তাঁর প্রভাব ধীরে ধীরে কমে আসে, বিশেষ করে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে কিম জং উন ও তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠকের সময় তাঁকে আর তেমন দেখা যায়নি। ২০১৯ সালের এপ্রিলে চো রিয়ং হে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন।
পিয়ংইয়ংয়ের সন্তান কিম ইয়ং নাম শিক্ষা লাভ করেন কিম ইল সুং বিশ্ববিদ্যালয় ও মস্কো স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে। জীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ পার্টি সৈনিক, বিপ্লবের এক অনড় প্রতীক, যাঁর জীবনযাত্রা আজও উত্তর কোরিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে অনুরণিত।
















