গ্রিনল্যান্ডের বরফ স্তরের গভীরে ড্রিলিং বা ছিদ্র করে বিজ্ঞানীরা এর অতীত এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এক চমকপ্রদ তথ্য খুঁজে পেয়েছেন। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রিনল্যান্ডের বরফ স্তরের একটি প্রধান উচ্চ স্থান প্রুডো ডোম। ৭ হাজার বছর আগে একটি মৃদু প্রাকৃতিক উষ্ণায়ন সময়ে সম্পূর্ণ গলে গিয়েছিল। এই বিশাল বরফের স্তরটি যতটা স্থিতিশীল বলে মনে করা হতো, আসলে এটি তার চেয়ে অনেক বেশি ভঙ্গুর। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, আজকের মানুষের সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই বরফ গলে যাওয়ার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত শুরু হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অ্যাট বাফেলো ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত গ্রিনড্রিল প্রকল্পের প্রথম গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। বিজ্ঞানীরা গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বরফের ১ হাজার ৬৬৯ ফুট নিচে পাথর ও পলল সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। গবেষণাপত্রটি নেচার জিওসায়েন্সে প্রকাশিত হয়েছে।
এই গবেষণার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে বাফেলো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেসন ব্রিনার বলেন, ৭ হাজার বছর আগের সেই সময়টি জলবায়ুগতভাবে অত্যন্ত স্থিতিশীল ছিল। তখন মানুষ কৃষিকাজ এবং সভ্যতার দিকে প্রথম পদক্ষেপ নিচ্ছিল। সেই সময়কার মৃদু উষ্ণায়নেই যদি প্রুডো ডোম সম্পূর্ণ গলে গিয়ে থাকে, তবে আজকের মানুষের সৃষ্ট তীব্র উষ্ণায়নের ফলে এটি আবার গলে যেতে খুব বেশি সময় লাগবে না।
বিজ্ঞানীদের কাছে চাঁদের পাথর বা মাটির নমুনার চেয়েও গ্রিনল্যান্ডের বরফের নিচে থাকা নমুনার সংখ্যা কম। অথচ এই পাথর ও পললগুলোর রাসায়নিক চিহ্নই বলে দিতে পারে যে শেষ কবে ওই উপরিভাগ সূর্যের আলো দেখেছিল। বিজ্ঞানীরা লুমিনেসেন্স ডেটিং নামক পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। এই পদ্ধতিতে খনিজ কণাগুলোর মধ্যে আটকে পড়া শক্তির পরিমাণ পরিমাপ করা হয়। যখন এই কণাগুলো মাটির নিচে চাপা থাকে, তখন তারা তেজস্ক্রিয়তা থেকে ইলেকট্রন সংগ্রহ করে। কিন্তু যখনই তারা সূর্যের আলোর সংস্পর্শে আসে, সেই শক্তি নির্গত হয়ে যায়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রুডো ডোম সামিটের নিচের পললগুলো শেষবার সূর্যের আলো দেখেছিল প্রায় ৬ হাজার থেকে ৮ হাজার ২০০ বছর আগে। ওই সময়ে সেখানে কোনো বরফ ছিল না।
গবেষণার প্রধান লেখক ক্যালেব ওয়ালকট-জর্জ জানান, তৎকালীন সময়ে তাপমাত্রা বর্তমানের তুলনায় মাত্র ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। অনেক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২১০০ সালের মধ্যে ওই অঞ্চলে তাপমাত্রার বৃদ্ধি এই পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে। গ্রিনল্যান্ডের কোন কোন অংশ সব থেকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, তা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করার মাধ্যমে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অনেক বেশি নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব হবে। এটি উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গেম-চেঞ্জার হিসেবে কাজ করবে।
২০২৩ সালের বসন্তকালীন অভিযানে বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করেছেন। ড্রিলিং চলাকালীন একটি ফাটল দেখা দিলে মিশনটি প্রায় ব্যর্থ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পাথরের জন্য ব্যবহৃত বিশেষ ড্রিল বিট ব্যবহার করে তারা ৩৯০ ফুট পথ পাড়ি দিয়ে মাটির নাগাল পান। জেসন ব্রিনার এই উত্তেজনাকে একটি হাড্ডাহাড্ডি ফুটবল ম্যাচের সঙ্গে তুলনা করেছেন। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন এটি কেবল শুরু মাত্র। সংগৃহীত কোর নমুনাগুলোতে প্রাচীন উদ্ভিদের চিহ্ন থাকতে পারে, যা গ্রিনল্যান্ডের সে সময়কার পরিবেশ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য দেবে। গ্রিনড্রিল প্রকল্পটি প্রমাণ করেছে, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বরফের নিচের শিলাখণ্ডে পৌঁছে সরাসরি পর্যবেক্ষণলব্ধ তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব, যা জলবায়ু পরিবর্তনের গতি বুঝতে অপরিহার্য।
















