বিশ্ব যেন ক্রমেই ভাগ হয়ে যাচ্ছে—একদিকে বার্ধক্যপীড়িত ধনী রাষ্ট্র, অন্যদিকে দারিদ্র্যে জর্জরিত জনবহুল দেশগুলো। এ দুই মেরুর টানাপোড়েনের ফাঁকেই তৈরি হচ্ছে এক আসন্ন স্রোত—অভিবাসনের জলোচ্ছ্বাস, যা থামানো দুষ্কর।
অর্থনীতিবিদ নোয়া স্মিথ তাঁর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে সতর্ক করেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয়তাবাদী নীতি ও নতুন বাণিজ্যযুদ্ধ শেষ পর্যন্ত যে সমস্যাকে রুখতে চায়, সেটিকেই আরও উসকে দেবে। যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্ক, আফ্রিকার ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আর পাকিস্তানের প্রতি কঠোরতা—সব মিলিয়ে ধনী-দরিদ্র ব্যবধানকে আরও গভীর করছে, যার পরিণতি হবে ব্যাপক অভিবাসন সংকট।
বিশ্বের দরিদ্র দৈত্য পাঁচ দেশ—পাকিস্তান, নাইজেরিয়া, কঙ্গো, ইথিওপিয়া ও তানজানিয়া। ২০২৫ সালে যাদের মাথাপিছু আয় ৭ হাজার ডলারের নিচে, আগামী শতাব্দীর শেষে এই পাঁচ দেশেই বাস করবে প্রায় দুইশ কোটি মানুষ—মানবজাতির এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি।
ধনী দেশগুলো জনসংখ্যা হ্রাসে ভুগছে, বিপরীতে এই পাঁচ দেশে জন্মহার এখনো থামেনি। দরিদ্রতা যেমন ক্ষুধার জন্ম দেয়, তেমনই তা জন্ম দেয় জনবিস্ফোরণের। পাকিস্তান সামান্য এগোলেও নাইজেরিয়া, কঙ্গো, ইথিওপিয়া ও তানজানিয়া রয়ে গেছে স্থবিরতার কাদায়। নাইজেরিয়ার আয় ক্রমে কমছে, কঙ্গোর দুর্ভিক্ষ ও যুদ্ধ থামেনি, আর তানজানিয়া ও ইথিওপিয়া এখনো দূরের পথের পথিক।
নোয়া স্মিথের মতে, এই স্থবিরতা একদিন সমগ্র বিশ্বের সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। ধনী রাষ্ট্রগুলো এখনো চোখ ফিরিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু খুব শিগগিরই তা অসম্ভব হয়ে উঠবে। কারণ, অর্থনৈতিক দিক থেকে ধনী দেশগুলো সংকুচিত হচ্ছে, আর দরিদ্র দেশগুলো বিস্ফোরিত। এই বৈষম্য তৈরি করবে বিশাল মানবপ্রবাহ—যার স্রোত ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার সমৃদ্ধ নগরীগুলোর দিকে ধাবিত হবে।
ইতিহাস বলে, যখন কোনো দেশের মাথাপিছু আয় ৮ থেকে ১২ হাজার ডলারে পৌঁছায়, তখনই অভিবাসনের প্রবণতা চূড়ান্তে ওঠে। সেই পথে হাঁটছে পাকিস্তান ও আফ্রিকার দেশগুলো। ফলে আগামী দশকগুলোতে ধনী রাষ্ট্রগুলোর সীমানায় বাড়বে প্রবল চাপ—মানুষের ভিড়, বেঁচে থাকার আর্তি, ও রাজনৈতিক অস্থিরতা।
এই সংকট ঠেকাতে যা দরকার, তা হলো দরিদ্র দেশগুলোর অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ। স্মিথের মতে, প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত ধনী দেশগুলোর বাজার উন্মুক্ত করা। যখন যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকান গ্রোথ অ্যান্ড অপরচুনিটি অ্যাক্ট (AGOA) চালু করেছিল, তখন আফ্রিকার রপ্তানি বেড়েছিল, কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছিল, অর্থনীতি কিছুটা প্রাণ ফিরে পেয়েছিল। কিন্তু এখন সেই উদ্যোগের অবসান ঘটেছে—যা আফ্রিকার জন্য এক ভয়াবহ ধাক্কা।
ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্কনীতি আফ্রিকার চারটি প্রধান দেশ ও পাকিস্তানের জন্য আরও বিপর্যয় বয়ে আনবে। অর্থনীতিবিদের মতে, “যা ট্রাম্পের জাতীয়তাবাদী গর্বকে তৃপ্ত করবে, তাই শেষ পর্যন্ত আমেরিকার দোরগোড়ায় এনে দেবে হাজারো নতুন শরণার্থী।”
আরও এক উপায়—বিদেশি সাহায্য। যদিও অনেকেই বলেন সাহায্য উন্নয়ন আনে না, তবু গবেষণায় দেখা গেছে, সরাসরি জনগণের কল্যাণে দেওয়া সাহায্য দারিদ্র্য কমায়, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা উন্নত করে, আর দীর্ঘমেয়াদে জন্মহার হ্রাসে সহায়তা করে। অর্থাৎ, তা কেবল মানবিক নয়—কৌশলগতভাবেও প্রয়োজনীয়।
তবে স্মিথ সতর্ক করেছেন—এই সাহায্য যেন সরকার নয়, জনগণের হাতে পৌঁছায়। কারণ, পাকিস্তানের মতো দেশগুলো বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক ঋণকে রাজনৈতিক টিকে থাকার হাতিয়ার বানিয়েছে। ফলে দেশগুলো টিকেছে, কিন্তু উন্নয়ন হয়নি।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো যুদ্ধ ও অস্থিতিশীলতা। কঙ্গো, নাইজেরিয়া ও ইথিওপিয়া এখনো গৃহযুদ্ধ ও জাতিগত সহিংসতায় জর্জরিত। শান্তিরক্ষী বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো, কূটনৈতিক মধ্যস্থতা জোরদার করা—এসব পদক্ষেপই তাদের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করতে পারে।
স্মিথের মতে, এই দেশগুলো হয়তো কখনো চীন বা ভারতের মতো শক্তিধর হবে না, কিন্তু যদি ধনী বিশ্ব সামান্য আন্তরিকতা দেখায়, তবে তাদের জীবনযাত্রা টেকসই ও মানবিক হতে পারে।
না হলে পৃথিবী একদিন এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হবে, যেখানে অধিকাংশ মানুষ বাস করবে ভগ্ন রাষ্ট্রে—ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর ভয়ের অন্ধকারে।
















