বৈরিতার ধোঁয়াশার মধ্যেও আলো দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণ চীন সাগরের ঢেউয়ের মতো অনিশ্চিত এক সম্পর্কের ভেতর, এবার যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একসঙ্গে হাঁটতে শুরু করেছে সামরিক যোগাযোগের নতুন পথে।
শনিবার এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানান, তিনি ও চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী দং জুন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ চ্যানেল স্থাপনের। উদ্দেশ্য—“যে কোনো সংঘাত বা ভুল বোঝাবুঝি নিরসন ও উত্তেজনা প্রশমিত করা।”
এই সিদ্ধান্ত আসে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে অনুষ্ঠিত ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের ঐতিহাসিক বৈঠকের পর, যেখানে দুই দেশের শীর্ষনেতারা বাণিজ্যযুদ্ধের ধোঁয়াশা কাটিয়ে সম্পর্কের নতুন সূর্যের প্রতিশ্রুতি দেন।
চীনের পক্ষ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি, তবে হেগসেথ জানান, মালয়েশিয়ায় আসিয়ান সম্মেলনের ফাঁকে তাঁর সঙ্গে দং জুনের সাক্ষাতে উভয়েই একমত হন—শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সৌহার্দ্যই দুই “মহান ও শক্তিশালী” দেশের জন্য শ্রেষ্ঠ পথ।
দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষজ্ঞরা এমন যোগাযোগ ব্যবস্থার পক্ষে ছিলেন। প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের নৌবাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতি প্রায়ই অনিচ্ছাকৃত সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি করে। কিন্তু নানা সময়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েনে এই সংলাপগুলো থেমে গেছে, ভেঙে পড়েছে বিশ্বাসের সেতু।
২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে দুই দেশের প্রায় ৯০টি যোগাযোগ চ্যানেলের বেশিরভাগই নিস্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফরের পর চীন অবশিষ্ট সামরিক সংলাপও বন্ধ করে দেয়। সেই ক্ষোভের প্রতিফলন দেখা যায় দক্ষিণ চীন সাগর ও তাইওয়ান প্রণালিতে একের পর এক “বিপজ্জনক” মুখোমুখি অবস্থানে।
তবে ২০২৩ সালের নভেম্বরে বাইডেন ও শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পর কিছুটা বরফ গলেছিল। এবার ট্রাম্পের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পর নতুনভাবে শুরু হচ্ছে সেই প্রচেষ্টা—আরও সংগঠিত, আরও স্থায়ী যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে।
গত ৩০ অক্টোবর বুসানে ট্রাম্প-শি বৈঠকে বাণিজ্য যুদ্ধের উত্তাপ কিছুটা প্রশমিত হয়। ট্রাম্প ঘোষণা দেন, চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক ৫৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪৭ শতাংশে নামানো হবে। চীনও বিরল ধাতুর সরবরাহ বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়। যদিও টিকটক বিক্রি বা এনভিডিয়ার চিপ বিক্রির বিষয়ে কোনো সমঝোতা হয়নি।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি আগামী এপ্রিলে চীন সফরে যাবেন এবং তার পরপরই শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্রে আসবেন।
মালয়েশিয়ায় দং জুনের সঙ্গে সাক্ষাতে হেগসেথ বলেন, “ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত চায় না, কিন্তু নিজের স্বার্থ ও মিত্রদের সুরক্ষায় সদা প্রস্তুত।”
অন্যদিকে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দং হেগসেথকে বলেছেন—চীন ও তাইওয়ানের পুনর্মিলন একটি “অপরিবর্তনীয় ঐতিহাসিক ধারা”। যুক্তরাষ্ট্রকে এই বিষয়ে সংযম ও সতর্কতার আহ্বান জানান তিনি।
বেইজিংয়ের বক্তব্যে বলা হয়েছে, চীন শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের পথে অটল, তবে জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তার প্রস্তুতি সম্পূর্ণ।
দুই দেশের মধ্যে এই নতুন যোগাযোগের অঙ্গীকার যেন কূটনীতির এক নিঃশব্দ কবিতা—যেখানে প্রতিটি শব্দে মিশে আছে সতর্ক আশার সুর।
















