আটলান্টিক মহাসাগরের ভয়ংকর মুখোশ পরে তাণ্ডব চালিয়েছে হারিকেন মেলিসা। পুরো ক্যারিবীয় অঞ্চল জুড়ে এখন মৃত্যু, ধ্বংস আর আর্তনাদের এক দীর্ঘ ছায়া। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ঝড়ে প্রাণ গেছে অন্তত ৪৯ জনের, তবে উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে হাইতিতে। দেশটি সরাসরি আঘাত না পেলেও কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে ভেসে গেছে জনপদ, ভেঙে পড়েছে পাহাড়ি ঢাল। দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ৩০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা গেছে এবং আরও ২০ জন এখনো নিখোঁজ।
জ্যামাইকায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯-এ, আর ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রে প্রাণ গেছে একজনের।
মঙ্গলবার জ্যামাইকায় আঘাত হানে মেলিসা, তখন এটি ছিল ক্যাটাগরি-৫ মাত্রার ঘূর্ণিঝড়—বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ২৯৫ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছায়। রাজধানী কিংস্টন সরাসরি আঘাত থেকে রক্ষা পেলেও দ্বীপের পশ্চিম অংশে যেন মৃত্যু নেমে আসে। সরকারি ভাষায়—“এটি ছিল এক ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ।”
জ্যামাইকার পর ঝড়টি কিউবায় পৌঁছায় কিছুটা দুর্বল অবস্থায়, তখন সেটি ক্যাটাগরি-৩ তে নেমে আসে। এরপর বাহামা অতিক্রম করে বৃহস্পতিবার রাতের দিকে বারমুডার উপকূল ঘেঁষে অগ্রসর হয়। মার্কিন ন্যাশনাল হারিকেন সেন্টারের হিসেবে, এটি বারমুডা থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূর দিয়ে অতিক্রম করবে।
ঝড়ের প্রভাব পুরো উত্তর ক্যারিবীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রবল বাতাস, বৃষ্টিপাত ও বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। হাইতি ও ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র সরাসরি আঘাত না পেলেও নদী উপচে পড়া বন্যায় নিমজ্জিত বহু এলাকা।
কিউবায় এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি, তবে দেশটির পূর্বাঞ্চল প্রবল ঝড়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষ; শুধু জ্যামাইকাতেই প্রায় ৭০ শতাংশ গ্রাহক বিদ্যুৎহীন বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
স্থানীয় প্রশাসন ধ্বংসস্তূপ সরাতে, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ পুনরুদ্ধারে দিনরাত কাজ করছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, এখনো ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ হিসাব বের করা যায়নি, তবে প্রাথমিকভাবে জ্যামাইকায় যে ধ্বংস দেখা গেছে তা দ্বীপটির ইতিহাসে “অতুলনীয়”।
জাতিসংঘের জ্যামাইকায় নিযুক্ত প্রতিনিধি ডেনিস জুলু বলেন, “এই দ্বীপ এমন ক্ষয়ক্ষতি আগে কখনো দেখেনি।”
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ঘোষণা দিয়েছেন, হাইতি, জ্যামাইকা, বাহামা ও কিউবায় সহায়তা পাঠাতে যুক্তরাষ্ট্রের “ডিজাস্টার অ্যাসিস্ট্যান্স রেসপন্স টিম” মোতায়েন করা হয়েছে।
মার্কিন আবহাওয়া সংস্থা অ্যাকিউওয়েদার-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, হারিকেন মেলিসার কারণে ক্ষয়ক্ষতি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব ৪৮ থেকে ৫২ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে হতে পারে।
ঝড় থেমে গেছে, কিন্তু আকাশ এখনো কান্নায় ভিজে। বিধ্বস্ত ক্যারিবীয় জনপদে, যেখানে একসময় ছিল গান ও নৃত্যের দ্বীপজীবন—সেখানে এখন কেবলই শোক, কাদা আর নিস্তব্ধতার নিঃশ্বাস।















