বিশ শতকের শুরুর দিকে যখন চিকিৎসা পেশা প্রায় পুরোপুরি পুরুষদের দখলে এবং ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নারীদের জন্য প্রায় বন্ধ ছিল, তখন উপনিবেশিক ভারতের এক তরুণী চিকিৎসক সেই বাধা ভেঙে ইতিহাস গড়েছিলেন।
১৯১২ সালে জামিনি সেন ব্রিটেনের একটি প্রাচীন চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ফেলো হিসেবে নির্বাচিত প্রথম নারী হন। ১৫৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন নারীদের জন্য উন্মুক্ত ছিল না।
তবে তার অসাধারণ সাফল্য সত্ত্বেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার নাম প্রায় বিস্মৃত হয়ে যায়। এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর তার জীবনকাহিনি নতুনভাবে সামনে এসেছে, যেখানে তার সংগ্রাম ও অবদান তুলে ধরা হয়েছে।
১৮৭১ সালে তৎকালীন বাংলার বরিশালে জন্ম নেওয়া জামিনি সেন শিক্ষাজীবন শুরু করেন কলকাতার বেথুন কলেজে। পরে তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে ১৮৯৭ সালে চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করেন, যখন এই পেশায় নারী উপস্থিতি ছিল খুবই কম।
পড়াশোনা শেষ করে তিনি নেপালে রাজপরিবারের চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালের দায়িত্ব নেন। সেখানে প্রায় এক দশক কাজ করে তিনি আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ব্রিটেনে যান। সেখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা শেষে গ্লাসগোর ঐতিহাসিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সফল হন এবং প্রথম নারী হিসেবে ফেলো নির্বাচিত হন।
তবে এই সাফল্যের পরও তার সুযোগ-সুবিধা পুরুষ সহকর্মীদের তুলনায় সীমিত ছিল। তারপরও তিনি থেমে থাকেননি।
ভারতে ফিরে তিনি বিভিন্ন শহরে কাজ করেন এবং মহামারি ও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও চিকিৎসাসেবা দিয়ে যান। বিশেষ করে প্রসূতি মায়েদের চিকিৎসায় তার অবদান উল্লেখযোগ্য ছিল। রোগীদের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রিয় এক চিকিৎসক।
ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। নেপালে থাকা অবস্থায় তিনি এক কন্যাশিশুকে দত্তক নেন, কিন্তু পরে সেই শিশুর মৃত্যু তাকে গভীরভাবে আঘাত করে।
তার জীবনের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে কিছু সামগ্রী ও ছবি সংরক্ষিত রয়েছে, যা তার অবদানের সাক্ষ্য বহন করে।
১৯৩২ সালে তার মৃত্যু হলেও দীর্ঘদিন তার অবদান আড়ালে ছিল। অবশেষে সাম্প্রতিক সময়ে তাকে যথাযথ সম্মান জানানো হয়েছে।
জামিনি সেনের জীবন প্রমাণ করে, আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাস শুধু ইউরোপ বা পুরুষদের দ্বারা গড়ে ওঠেনি; এতে এক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বাঙালি নারীর অবদানও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
















