জাতীয় নির্বাচনের পর দৃশ্যপট বদলালেও পুলিশি হয়রানি ও ‘বকশিশ’ প্রথা সচল; সবজির দামে প্রভাব পড়ার আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রশাসনিক কড়াকড়ি বাড়লেও মহাসড়কগুলোতে পণ্যবাহী ট্রাক ও পিকআপে চাঁদাবাজি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। উত্তরবঙ্গ থেকে রাজধানী ঢাকা অভিমুখে আসা সবজি ও পণ্যবোঝাই ট্রাকগুলোকে এখনো বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশ এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের নামে নির্দিষ্ট অংকের টাকা দিতে হচ্ছে। ট্রাকচালক ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরাসরি রসিদ দিয়ে চাঁদা আদায়ের প্রবণতা কিছুটা কমলেও ‘কাগজপত্র চেক’ বা ‘চা-পানের খরচ’ হিসেবে পুলিশি হয়রানি রয়ে গেছে আগের মতোই। এর ফলে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে সবজির দামে, যা সাধারণ ভোক্তাদের পকেট কাটছে। যদিও হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে দায়ী সদস্যদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বগুড়ার মহাস্থান হাট থেকে ঢাকা ও গাজীপুরগামী ট্রাকচালকদের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, একটি তিন টনের ট্রাক গন্তব্যে পৌঁছাতে মাসে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। বগুড়ার চারমাথা, বনানী, মির্জাপুর এবং সিরাজগঞ্জের চান্দাইকোনা ও যমুনা সেতুর পশ্চিম পাড় এলাকায় পুলিশের তল্লাশির মুখে পড়তে হয় চালকদের। অনেক ক্ষেত্রে বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত ‘খরচ’ না দিলে গাড়ি আটকে রাখার অভিযোগ করেছেন চালক ফারুক হোসেন। একইভাবে যশোর থেকে ঢাকা আসার পথেও ট্রাক প্রতি অতিরিক্ত দেড় থেকে দুই হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। এই খরচের তালিকায় রয়েছে ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির কমিশন, লেবার বকশিশ এবং বিভিন্ন পৌরসভার নামে তোলা টোল। চালকদের মতে, লাঠি হাতে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য আগের চেয়ে কমলেও পার্কিং ও লাইনম্যানের নামে অদৃশ্য চাঁদা এখনো সচল।
দক্ষিণাঞ্চল ও চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থেকেও নিমসার বা ঢাকার আড়তগুলোতে সবজি পৌঁছাতে একই ধরণের বিড়ম্বনার কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল এলাকায় অপেক্ষমান চালকরা জানান, মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুর বা রায়গঞ্জের ধানগড়া মোড়ের মতো পয়েন্টগুলোতে এখনো ছোট ছোট অংকের টাকা দিতে হয়। তবে পরিবহন সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অতীতের তুলনায় বর্তমানে মহাসড়কের পরিবেশ কিছুটা উন্নত হয়েছে এবং প্রকাশ্য চাঁদাবাজি অনেকলাংশে কমেছে। কিন্তু রাতের আঁধারে বা চেকপোস্টের নামে চলা এই ‘অঘোষিত কর’ বন্ধ না হলে কৃষিপণ্যের সরবরাহ চেইন বাধাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা কাটছে না। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেবল আড়তে অভিযান নয়, বরং মহাসড়কের এই অদৃশ্য চাঁদাবাজি নির্মূল করা জরুরি।
















