বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ১৬ ফেব্রুয়ারি পদ ছাড়েন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। ৮৫ বছর বয়সে তিনি এমন এক সময় দেশকে নির্বাচিত সরকারের হাতে তুলে দিলেন, যখন দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের পর রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটছিল। তবে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় রাজনীতিতে নয়—দারিদ্র্য দূরীকরণে ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক ব্যবসার পথিকৃৎ হিসেবে।
অর্থনীতিতে উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরে ইউনূস উপলব্ধি করেন, তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বাস্তব জীবনের দারিদ্র্য সংকটের সঙ্গে যুক্ত করাই হবে তার কাজ। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলাদেশে মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই ছিল তীব্র। তিনি বুঝলেন, দান-সহায়তার চক্র থেকে মানুষকে বের করতে হলে দরকার সুযোগ—বিশেষত ঋণ পাওয়ার সুযোগ।
গ্রামীণ ব্যাংকের সূচনা
১৯৭২ সালে তিনি গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। খুব ছোট অঙ্কের ঋণ—২৭ থেকে ৪২ ডলার—গ্রামের দরিদ্র নারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এই সামান্য অর্থ অনেকের জীবন বদলে দেয়। আজ গ্রামীণ ব্যাংকের গ্রাহক প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ, যার ৯৭ শতাংশই নারী।
ইউনূসের মূল বিশ্বাস ছিল—দারিদ্র্য মানে সক্ষমতার অভাব নয়; বরং সম্পদ ও সুযোগে প্রবেশাধিকার না থাকা। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা দরিদ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ ধরে নিয়ে ঋণ দিতে অস্বীকৃতি জানাত। ক্ষুদ্রঋণ সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের হার প্রায় ৯৮ শতাংশ, যা অনেক প্রচলিত ব্যাংকের চেয়েও বেশি।
সামাজিক ব্যবসার ধারণা
ইউনূস দেখিয়েছেন, মুনাফাভিত্তিক ব্যবসা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা পরস্পরবিরোধী নয়। সামাজিক লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে ব্যবসা পরিচালনা করলে তা দাননির্ভর নয়, টেকসই হতে পারে। এই ধারণার জন্য তিনি ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান।
ক্ষুদ্রঋণ কেবল অর্থনৈতিক কর্মসূচি নয়; এটি সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও ক্ষমতায়নের মাধ্যম। ঋণপ্রাপ্ত নারীরা আর্থিক স্বাধীনতা অর্জন করেছেন, পরিবারে সিদ্ধান্তে অংশ নিচ্ছেন এবং সমাজে মর্যাদা পাচ্ছেন। প্রায় ৭০ শতাংশ গ্রাহক দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করেছেন বলে বিভিন্ন মূল্যায়নে দেখা গেছে।
প্রভাব ও উত্তরাধিকার
ক্ষুদ্রঋণ এখন একটি বৈশ্বিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে, যার বাজারমূল্য চলতি দশকের শেষে প্রায় ৩৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হয়। বাংলাদেশ ছাড়াও বহু দেশে এই মডেল প্রয়োগ হয়েছে।
প্রতিটি প্রজন্মেরই এমন মানুষ দরকার, যারা প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করেন। ইউনূস দারিদ্র্যকে দেখেছেন ভিন্ন চোখে—সহানুভূতির নয়, সম্ভাবনার দৃষ্টিতে। বিদ্যমান ঋণব্যবস্থাকেই তিনি রূপান্তরিত করেছেন, যাতে সুবিধাভোগী হয় সমাজের প্রান্তিক মানুষ।
দারিদ্র্য থেকে মুক্তির পথ যে দানের মাধ্যমে নয়, বরং আস্থাভিত্তিক সুযোগের মাধ্যমে—এই শিক্ষা রেখে গেছেন বাংলাদেশের এই দূরদর্শী অর্থনীতিবিদ।
















