বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা প্রতিহিংসা, কাদা ছোড়াছুড়ি এবং প্রতিপক্ষকে শত্রু ভাবার যে সংস্কৃতি, তা থেকে বেরিয়ে আসার একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর। বিশেষ করে ১৭ বছরের প্রবাস জীবনের অবসান ঘটিয়ে দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেভাবে ‘পজিটিভ পলিটিক্স’ বা ইতিবাচক রাজনীতির ডাক দিয়েছেন, তা দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে এই উদারতার বিপরীতে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের মিত্রদের ভূমিকা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও সংশয় দেখা দিয়েছে।
তারেক রহমানের ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ রাজনীতি ও উদারতার দৃষ্টান্ত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বেশ কিছু নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিরল:
- প্রতিপক্ষের দুয়ারে প্রধানমন্ত্রী: নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর অহংকার না করে তিনি নিজে ছুটে গেছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলামের বাসভবনে। এটি ক্ষমতার দম্ভের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে নিয়ে দেশ গড়ার একটি শক্তিশালী বার্তা।
- ইফতার মাহফিলে অংশগ্রহণ: শত ব্যস্ততা এবং জামায়াতের পক্ষ থেকে শপথ অনুষ্ঠান বর্জনের মতো নেতিবাচক আচরণের পরও তিনি তাদের ইফতার মাহফিলে যোগ দিয়েছেন। সেখানে তিনি ব্যক্তিগত বা দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য শপথ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
- উস্কানি উপেক্ষা করা: নির্বাচনী প্রচারণার সময় জামায়াত নেতাদের পক্ষ থেকে নানা নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হলেও তারেক রহমান তার পাল্টা জবাব না দিয়ে ধৈর্য ও রাজনৈতিক পরিপক্কতার পরিচয় দিয়েছেন।
জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা: সহযোগিতার অভাব নাকি রাজনৈতিক কূটিলতা?
সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকারি দল ও বিরোধী দল একটি গাড়ির দুটি চাকার মতো। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে বিশ্লেষকরা চিন্তিত। এর কারণগুলো হলো:
- শপথ বর্জন: প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান বর্জন করে জামায়াত ও এনসিপি শুরুতেই একটি নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে, যা গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী।
- ক্রমাগত অভিযোগ: সরকার গঠনের পর যেখানে দেশ পুনর্গঠনে ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন, সেখানে জামায়াত নেতারা বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের বিরুদ্ধে বিষোদগার ও অভিযোগ তুলছেন।
- উদারতা গ্রহণে ব্যর্থতা: প্রধানমন্ত্রীর বারবার বাড়িয়ে দেওয়া বন্ধুত্বের হাত এবং উদারতাকে জামায়াত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে পারছে না বলে মনে হচ্ছে। তাদের জ্যেষ্ঠ নেতাদের বক্তব্যে এখনো পুরনো প্রতিহিংসার ছায়া দেখা যাচ্ছে।
রাজনৈতিক পরিপূরকতা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
বিজ্ঞজনদের মতে, দেশ চালাতে হলে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে একটি ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধ ও কাজের সমন্বয় থাকতে হয়। ১২ মার্চ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে। সেখানে এই দুই শক্তি একই তালে (পজিটিভ রাজনীতি) চলতে পারবে কি না, তা-ই এখন দেখার বিষয়।
“দেশ পরিচালনায় সরকারি দল ও বিরোধী দল একে অপরের পরিপূরক। তারেক রহমান যে উদারতার পথ দেখাচ্ছেন, বিরোধী দল যদি সেই পথে না হাঁটে, তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ।”
প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে মুক্তির পথ কী?
তারেক রহমানের ‘সবাইকে নিয়ে দেশ গড়ার’ ব্রত সফল করতে হলে কেবল সরকারি দলের উদারতা যথেষ্ট নয়; বিরোধী দলকেও সেই উদারতার মর্মবাণী বুঝতে হবে। জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি দলের উচিত পুরনো কাদা ছোড়াছুড়ি ও প্রতিহিংসার পথ ত্যাগ করে দায়িত্বশীল বিরোধী দলের পরিচয় দেওয়া। অন্যথায়, তারেক রহমানের এই মহতী উদ্যোগ কেবল একতরফা প্রচেষ্টায় সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।
















