মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে শান্তির দূত হিসেবে উপস্থাপন করছেন। তাঁর দাবি, গাজা ও ইউক্রেনের যুদ্ধ শেষ করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর এই প্রচেষ্টা এখনো কেবল প্রতীকি পর্যায়েই সীমাবদ্ধ, বাস্তবসম্মত কোনো সমাধান সেখানে নেই।
সমস্যার মূল কারণ ট্রাম্পের ভুল ধারণা—তিনি “শান্তি”কে “যুদ্ধবিরতি”র সমার্থক ভেবে বসেছেন। ইতিহাস বলছে, কেবল যুদ্ধবিরতি কখনো স্থায়ী শান্তি আনে না। যুদ্ধ শেষ করতে হলে রাজনৈতিক বিরোধের মূল কারণগুলো সমাধান করতে হয়, যা ট্রাম্প এখনো করেননি।
গাজা সংকট নিয়ে ট্রাম্প একটি “শান্তি পরিকল্পনা” উপস্থাপন করেছেন, তবে সেটি কার্যত কেবল যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব। এতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি উপেক্ষিত হয়েছে। প্রকৃত শান্তির জন্য প্রয়োজন—ইসরায়েলের গণহত্যা বন্ধ, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, ফিলিস্তিনের জাতিসংঘ সদস্যপদ, এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের সঙ্গে বিশ্বব্যাপী কূটনৈতিক সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ। এই মৌলিক উপাদানগুলো ট্রাম্পের পরিকল্পনায় অনুপস্থিত, যার ফলে কোনো দেশই এখন পর্যন্ত তা সমর্থন করেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই উদ্যোগ মূলত আরব ও মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে বাড়তে থাকা বৈশ্বিক সমর্থনকে দুর্বল করার কৌশল। এতে ইসরায়েলকে পশ্চিম তীর দখল ও গাজায় হামলা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, “নিরাপত্তা”র অজুহাতে মানবিক সহায়তা সীমিত করে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জাতিসংঘে স্পষ্ট করেছেন যে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের কোনো সুযোগ তিনি রাখতে চান না। ট্রাম্পের অবস্থানও কার্যত সেই নীতিকেই এগিয়ে নিচ্ছে। ফলে তাঁর পরিকল্পনাও ওসলো চুক্তি বা ক্যাম্প ডেভিডের মতোই ব্যর্থতার পথে হাঁটছে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যদি ট্রাম্প সত্যিই যুদ্ধ শেষ করতে চান, তবে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক-শিল্প গোষ্ঠী এবং বড় কর্পোরেট স্বার্থের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। গত দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ২১.৭ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দিয়েছে, যার বড় অংশই মার্কিন অস্ত্র শিল্পে ফিরে গেছে।
একইভাবে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও ট্রাম্প দাবি করেছেন যে তিনি “২৪ ঘণ্টার মধ্যে” যুদ্ধ বন্ধ করতে পারেন। কিন্তু তাঁর প্রস্তাবও কেবল যুদ্ধবিরতির, সমাধানের নয়। যুদ্ধের মূল কারণ—ন্যাটো সম্প্রসারণ ও ২০১৪ সালের যুক্তরাষ্ট্রপন্থী কিয়েভ অভ্যুত্থান—তিনি উপেক্ষা করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থায়ী শান্তির জন্য ইউক্রেনকে নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি।
২০২২ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে তুরস্কের মধ্যস্থতায় ইস্তাম্বুলে ইউক্রেনের নিরপেক্ষতা নিয়ে আলোচনা চললেও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের চাপেই তা ভেস্তে যায়। ফলে যুদ্ধ এখনো চলছে।
লেখকরা মনে করেন, প্রকৃত শান্তির জন্য রাজনীতির সাহসী ব্যবহার ও যুদ্ধবাণিজ্যের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা জরুরি। জন এফ কেনেডির পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টই সেই সাহস দেখাতে পারেননি।
তবে এখনও আশা আছে, কারণ বাস্তবতা কঠিন হলেও অস্বীকার করা যায় না। আসন্ন সময়ে ট্রাম্প যখন বুদাপেস্টে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন, তখন হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান তাঁকে বোঝাতে পারেন—ইউক্রেন শান্তির জন্য ন্যাটো সম্প্রসারণ বন্ধ করা অপরিহার্য।
একইভাবে, তুরস্ক, সৌদি আরব, মিশর ও ইন্দোনেশিয়ার নেতারা তাঁকে জানাতে পারেন যে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এখনই জরুরি, এটি কোনো ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি নয় বরং শান্তির মূল শর্ত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প যদি সত্যিই কূটনীতিতে ফিরতে পারেন এবং যুদ্ধবাজ ও লবিগোষ্ঠীর চাপ অগ্রাহ্য করেন, তবে তিনি আমেরিকান জনগণ ও বিশ্বের সমর্থন পেতে পারেন—আর সেটিই হবে বাস্তব শান্তির সূচনা।
















