ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু ক্ষমতা বদলের লড়াই নয়, রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রের এক ঐতিহাসিক পরীক্ষা। দীর্ঘ বিতর্কিত নির্বাচনি অভিজ্ঞতার পর প্রায় আড়াই কোটি নতুন ভোটার অংশ নিচ্ছে—যা রাজনৈতিক পুনর্গঠনের সম্ভাবনা তৈরি করলেও সমাজের একাংশে গভীর অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, উদারপন্থী ও অসাম্প্রদায়িক নাগরিকদের বড় অংশ এখনো নিশ্চিত নন—কোন রাজনৈতিক শক্তি তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার নিশ্চয়তা দেবে। বাস্তব বিকল্প সীমিত হওয়ায় কেউ তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ পক্ষ বেছে নেওয়ার কথা ভাবছেন, কেউ আবার কৌশলগত নীরবতার পথ নিচ্ছেন।
জুলাই ২০২৪–এর গণঅভ্যুত্থান দমন-পীড়ন, ভোটাধিকার হরণ ও বাকস্বাধীনতার সংকোচনের বিরুদ্ধে জনআকাঙ্ক্ষার বিস্ফোরণ ছিল। কিন্তু পরিবর্তনের পর সংস্কার, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের প্রতিশ্রুতি কাঠামোগত রূপ পায়নি—আইনশৃঙ্খলা দুর্বলতা, মব সহিংসতা ও সংখ্যালঘু স্থাপনায় হামলার ঘটনায় আস্থাহীনতা বেড়েছে।
বিএনপি সংগঠন মজবুত করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ভাষ্য সামনে আনলেও অতীত শাসনামলের অভিযোগ ও সাম্প্রতিক সহিংসতার প্রশ্নে স্পষ্টতার অভাব সমালোচনার জন্ম দিচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী তুলনামূলক নরম অবস্থান দেখালেও নীতিগত সীমাবদ্ধতা ও ইতিহাস-সংক্রান্ত দায়স্বীকারের অভাব তাদের বিশ্বাসযোগ্যতায় প্রশ্ন রাখছে। নতুন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টিও সাংগঠনিক দুর্বলতা ও বিতর্কিত সমঝোতার কারণে আস্থার ঘাটতিতে ভুগছে।
ফলে সংখ্যালঘু ও প্রগতিশীল নাগরিকদের একাংশ দ্বিধাগ্রস্ত। গণতন্ত্রের শক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন নয়, ভিন্নমতাবলম্বীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নির্বাচনের পর আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, সংখ্যালঘু সুরক্ষা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তা না এলে রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বাড়বে, বৈচিত্র্য কমবে এবং ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এই নির্বাচন তাই রাষ্ট্রতাত্ত্বিক প্রশ্নও উত্থাপন করছে: বাংলাদেশ কি ভিন্ন কণ্ঠ ও ভিন্ন বিশ্বাসের জন্য নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পারবে? উত্তর নির্ধারণ করবে দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ।
















