শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি। ২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে প্রায় ১,৪০০ মানুষের প্রাণহানির পর সৃষ্ট রাজনৈতিক পালাবদলের প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচনকে দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ নির্ধারণী ভোট হিসেবে দেখা হচ্ছে। মঙ্গলবার সকালেই আনুষ্ঠানিক প্রচার শেষ হয়েছে।
ভোটগ্রহণ শুরু হবে সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে এবং শেষ হবে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ৬৪ জেলায় ৪২ হাজার ৭৬১টি কেন্দ্রে ৩০০টি সংসদীয় আসনে ভোট নেওয়া হবে। নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। প্রথমবারের মতো ডাকযোগে ভোটের সুযোগ রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রবাসী শ্রমিকসহ প্রায় দেড় কোটি মানুষ অংশ নিতে পারবেন।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ একক কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা, যার মোট আসন ৩৫০টি। এর মধ্যে ৩০০টি সাধারণ আসনে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে সদস্য নির্বাচিত হন। বাকি ৫০টি নারী সংরক্ষিত আসন নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে দলগুলোর প্রাপ্ত আসন অনুপাতে বণ্টন করা হয়। যে দল ১৫১টি আসন পায়, তারা এককভাবে সরকার গঠন করতে পারে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পাওয়া দল হয় প্রধান বিরোধী দল।
এই নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ নিয়ে একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। ছাত্র আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে প্রণীত এই সনদে সংবিধান সংশোধন, আইনি সংস্কার ও নতুন আইন প্রণয়নের রূপরেখা রয়েছে।
২০২৪ সালের জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের পর একই বছরের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। সরকার কঠোর দমন-পীড়ন চালালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের হিসাবে, সহিংসতায় প্রায় ১,৪০০ জন নিহত ও ২০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। পরে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েন এবং বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। নভেম্বরে ট্রাইব্যুনাল তাঁকে অনুপস্থিতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তাঁর দল আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিষিদ্ধ রয়েছে।
নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন। তাঁর নেতৃত্বে সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হলেও আইনশৃঙ্খলা ও জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে সীমাবদ্ধতার অভিযোগ রয়েছে।
এই নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা দুটি জোটের মধ্যে। কেন্দ্র-ডানপন্থী বিএনপি নেতৃত্ব দিচ্ছে ১০ দলীয় জোটকে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রায় ১৭ বছর প্রবাসে থাকার পর দেশে ফিরে নির্বাচনী নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দলটি নিজেদের জাতীয়তাবাদী আদর্শের ধারক বলে দাবি করে এবং দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয়।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্ব দিচ্ছে ১১ দলীয় জোটকে। দলের আমির শফিকুর রহমান। স্বাধীনতার সময় দলটির অবস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ২০২৫ সালের জুনে তাদের নিবন্ধন পুনর্বহাল হয়। এবার তারা বিএনপির সঙ্গে জোট না করে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে। অমুসলিম ভোটারদের আকৃষ্ট করতে তারা খুলনা থেকে কৃষ্ণ নন্দী নামে এক হিন্দু প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে, যা দলটির ইতিহাসে প্রথম।
জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটে রয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি, যা ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের উদ্যোগে গঠিত। দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন ২৭ বছর বয়সী নাহিদ ইসলাম। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই নির্বাচন জামায়াতের প্রকৃত সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়ের পরীক্ষাও হবে।
জনমত জরিপে বিএনপি ও জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত মিলেছে। একটি জরিপে বিএনপির সমর্থন ৩৩ শতাংশ এবং জামায়াতের ২৯ শতাংশ দেখা গেছে।
ফলাফল সাধারণত পরদিন ভোর থেকে প্রকাশ পেতে শুরু করে। তবে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এবার সংসদীয় ব্যালটের পাশাপাশি গণভোটের ব্যালট গণনা করতে হওয়ায় সময় বেশি লাগতে পারে। প্রার্থী ও দলের সংখ্যাও তুলনামূলক বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় ১৭ বছর পর ভোটাররা একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অর্থবহ নির্বাচনের প্রত্যাশা করছেন। তরুণ ভোটারদের বড় অংশ এবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন, যাঁদের অনেকেই ২০২৪ সালের আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন।
একই সঙ্গে ইসলামপন্থী দলগুলোর উত্থান, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এবং ঐতিহ্যগত জোটগুলোর ভাঙন বাংলাদেশের রাজনীতিকে নতুন বাস্তবতায় নিয়ে গেছে। এই নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের লড়াই নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশ, গণতান্ত্রিক কাঠামো ও আন্তর্জাতিক অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
















