আর্জেন্টিনার প্যাটাগোনিয়া অঞ্চলে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়ছে। এতে এখন পর্যন্ত ৪৫০ বর্গকিলোমিটারের বেশি প্রাকৃতিক বনভূমি পুড়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী লস আলেরসেস ন্যাশনাল পার্কের অংশও। দাবানলের তীব্রতায় হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
চুবুত প্রদেশজুড়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় হুমকির মুখে পড়েছে হাজার হাজার বছরের পুরোনো আলেরসে গাছ, যেগুলোর আয়ু তিন হাজার ছয়শ বছরেরও বেশি হতে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দমকলকর্মীরা প্রবল বাতাস ও উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে লড়াই করছেন।
এই সংকটের মধ্যেই দেশটির প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের কৃচ্ছ্রনীতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। পরিবেশবাদী সংগঠন ফার্নের তথ্য অনুযায়ী, মিলেই সরকারের ব্যয়সংকোচন নীতির ফলে জাতীয় অগ্নি ব্যবস্থাপনা সংস্থার বাজেট বাস্তব অর্থমূল্যে গত বছরের তুলনায় ৭১ শতাংশ কমে গেছে।
ফার্নের অর্থনীতিবিদ আরিয়েল স্লিপাক বলেন, এই দাবানল পুরোপুরি অনুমানযোগ্য ছিল। তাঁর মতে, জরুরি প্রস্তুতির চেয়ে যেকোনো মূল্যে বাজেট ভারসাম্য রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলেই পরিস্থিতি এত ভয়াবহ হয়েছে।
চলতি মৌসুমে পুড়ে যাওয়া এলাকার পরিমাণ ইতোমধ্যে গত গ্রীষ্মের পুরো দাবানল মৌসুমের ক্ষতির চেয়েও বেশি। তখন ৩২৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বৃহস্পতিবার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন প্রেসিডেন্ট মিলেই এবং প্রায় ৬৯ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। গ্রিনপিসের হারনান জিয়ারদিনি বলেন, বিজ্ঞান ও পরিবেশ আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদের কথা বলে আসছে। তা অস্বীকার বা খাটো করে দেখানো রাজনৈতিক দায়িত্বহীনতা, যার মূল্য দিতে হচ্ছে বন ও মানুষের ঘরবাড়িকে।
মিলেই এর আগেও জলবায়ু পরিবর্তনকে ‘সমাজতান্ত্রিক মিথ্যা’ বলে মন্তব্য করেছিলেন এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার কথাও ভাবছেন। অথচ বর্তমান দাবানলে পুড়ে যাওয়া এলাকা রাজধানী বুয়েনস আয়ার্স শহরের আয়তনের দ্বিগুণেরও বেশি।
সবচেয়ে বড় দাবানল চলছে দক্ষিণ চুবুত প্রদেশে। জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে সেখানে ভয়াবহ আগুন ছড়িয়ে পড়ে। শত শত দমকলকর্মী আগুন জনবসতিতে পৌঁছানোর আগেই তা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছেন।
এই দাবানলকে প্যাটাগোনিয়া অঞ্চলের কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বলে মনে করা হচ্ছে। এখনো অগ্নিকাল মৌসুমের বড় অংশ বাকি থাকতেই পরিস্থিতি এতটা খারাপ হওয়ায় জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। মিলেই সরকারের গত দুই বছরের কঠোর কৃচ্ছ্রনীতি দমকল, পার্ক সুরক্ষা ও অগ্নিনিরোধ কর্মসূচির অর্থায়ন মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
লস আলেরসেস ন্যাশনাল পার্কের দায়িত্বে থাকা রেঞ্জার লুইস স্কিনেলি বলেন, দমকল ও বনরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, সীমিত জনবল নিয়ে বিশাল এলাকা রক্ষা করতে গিয়ে কর্মীরা চরম চাপের মধ্যে কাজ করছেন।
পার্ক প্রশাসনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যথাযথ সুরক্ষার জন্য অন্তত ৭০০ জন দমকলকর্মী প্রয়োজন। বর্তমানে সেখানে কর্মরত আছেন মাত্র ৩৯১ জন। মিলেই সরকারের সময়ে ছাঁটাই ও পদত্যাগের কারণে প্রায় ১০ শতাংশ জনবল কমে গেছে।
দমকলকর্মীরা জানিয়েছেন, বাজেট কমে যাওয়ায় প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জামের সংকট তৈরি হয়েছে। অনেককে পুরোনো বা দান করা সুরক্ষা পোশাক ব্যবহার করে আগুন নেভাতে হচ্ছে।
তবে পার্ক কর্তৃপক্ষ বলছে, অর্থের সংকট সব সরকারের আমলেই ছিল। তাদের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতেও দাবানল মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সম্পদ রয়েছে।
















