দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা ভারত–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সমঝোতায় অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের ওপর আরোপিত পারস্পরিক শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামানোর ঘোষণা দেওয়ার পর ভারতের অর্থনীতিতে স্বস্তির অনুভূতি তৈরি হয়েছে। তবে চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্ত ও বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো স্পষ্টতা নেই।
গত বছর আগস্টে ভারতের পণ্যের ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করেছিলেন ট্রাম্প। তখন তার অভিযোগ ছিল, ছাড়ে রাশিয়ার তেল কেনার মাধ্যমে ভারত ইউক্রেন যুদ্ধে মস্কোর অর্থায়নে সহায়তা করছে। এর ফলে ভারত বিশ্বে সর্বোচ্চ শুল্ক দেওয়া দেশের তালিকায় উঠে আসে।
সোমবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ফোনালাপের পর ট্রাম্প দাবি করেন, মোদি রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করতে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও সম্ভাব্যভাবে ভেনেজুয়েলা থেকে বেশি জ্বালানি কিনতে সম্মত হয়েছেন। তবে ভারত এই দাবির বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। মোদি ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারত্বকে নজিরবিহীন উচ্চতায় নিতে তিনি আশাবাদী।
এই সমঝোতার পেছনে রয়েছে ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক। যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, বিশেষ করে বস্ত্র, সামুদ্রিক খাবার ও গহনার মতো কর্মসংস্থাননির্ভর খাতে।
একই সঙ্গে এই চাপ ভারতকে অন্যান্য দেশের সঙ্গে দ্রুত বাণিজ্য চুক্তি করতে এবং নতুন রপ্তানি বাজার খুঁজতে বাধ্য করে। গত সপ্তাহে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বড় পরিসরের একটি বাণিজ্য চুক্তি ঘোষণা করে, যার আওতায় অধিকাংশ পণ্যের শুল্ক তুলে নেওয়া হয়েছে। এটি ছিল চার বছরে ভারতের নবম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি।
ট্রাম্পের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে ভারতের শিল্পখাত। বিনিয়োগ ব্যবস্থাপক নীলেশ শাহ বলেন, বিস্তারিত শর্ত এখনো স্পষ্ট না হলেও এই সিদ্ধান্ত রুপি, শেয়ারবাজার ও সুদের হারের ওপর ঝুলে থাকা অনিশ্চয়তা দূর করেছে।
শুল্কসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা গত বছর ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি বাড়া, রুপির দরপতন এবং বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল। নতুন ১৮ শতাংশ শুল্কহার ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশসহ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে ভারতের অবস্থানকে কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এতে সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্গঠনে চীনের বিকল্প হিসেবে ভারতের আকর্ষণ বাড়বে। কম শ্রমব্যয়, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বড় অভ্যন্তরীণ বাজারকে ভারতের বড় সুবিধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বস্ত্র রপ্তানিকারকরাও এই ঘোষণায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতা আরও সহজ হবে।
তবে বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানা। কোন পণ্য অন্তর্ভুক্ত হবে, সময়সীমা কী এবং সংবেদনশীল খাতে শূন্য শুল্ক বা অশুল্ক বাধা নিয়ে ভারত সত্যিই সম্মত হয়েছে কি না—এসব বিষয় পরিষ্কার নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই চুক্তির ফলে ভারতীয় বাজারে মার্কিন কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়বে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এই বিষয়ে ভারত এখনো কোনো মন্তব্য করেনি। ভারতের অর্ধেক জনগোষ্ঠী কৃষির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বিষয়টি দেশটির জন্য স্পর্শকাতর।
বিশ্লেষকদের মতে, যৌথ বিবৃতি ও চুক্তির লিখিত রূপ না আসা পর্যন্ত এটিকে একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই দেখা উচিত, চূড়ান্ত বাণিজ্য চুক্তি হিসেবে নয়।
তবে দীর্ঘ অচলাবস্থার পর আলোচনায় অগ্রগতি হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন অনেকে। তাদের মতে, এটি কেবল শুরু, সামনে আরও দফা আলোচনা হতে পারে।
ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ। গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির জেরে ভারত, চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছিল। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ হলে ভারত আবার ধীরে ধীরে ওয়াশিংটনের দিকে ঝুঁকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত কৌশলগতভাবে নিরপেক্ষ থাকতে চাইলেও এই সমঝোতা টেকসই হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
















