যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তুতির মধ্যেই কলম্বিয়ার মাদকবিরোধী নীতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর কৌশল—জোরপূর্বক কোকা উচ্ছেদের বদলে স্বেচ্ছাসেবী ফসল পরিবর্তন—এখন আন্তর্জাতিক নজরদারিতে।
কলম্বিয়ার নারিনো বিভাগের আওয়া আদিবাসী সংরক্ষিত এলাকায় কৃষক ইউলি কাইসেদো বৃষ্টিভেজা জমিতে কোকা গাছ উপড়ে ফেলছেন। চারপাশে আরও অনেক কৃষক একই কাজে ব্যস্ত। একসময় জীবিকার প্রধান উৎস হলেও এই কোকা গাছই কোকেনের কাঁচামাল হিসেবে সহিংসতা ও মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বে ব্যবহৃত কোকেনের প্রায় ৭০ শতাংশই আসে কলম্বিয়া থেকে।
দীর্ঘদিন ধরে দেশটি সেনা ও পুলিশের মাধ্যমে জোরপূর্বক কোকা উচ্ছেদের পথ বেছে নিয়েছিল। তবে প্রথম বামপন্থী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় এসে পেত্রো সেই নীতি বদলান। তার সরকার দরিদ্র গ্রামীণ কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন কঠোর অভিযান কমিয়ে স্বেচ্ছাসেবী ফসল পরিবর্তনের ওপর জোর দেয় এবং একই সঙ্গে মাদক পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর কথা বলে।
এই নীতির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা চাপে পড়ে। ট্রাম্প প্রশাসন আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পেত্রোর ওপর চাপ দিচ্ছে। তবে আওয়া সম্প্রদায়ের কাইসেদোর মতো অনেক কৃষক স্বেচ্ছায় কোকা উচ্ছেদে অংশ নিচ্ছেন। কাইসেদো জানান, মাদকচক্রের সহিংসতায় তার বাবার প্রাণ গেছে। তবুও বিকল্প জীবিকার অভাবে কোকা চাষ ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ ছিল না।
একই এলাকায় বসবাসকারী চার্লস মার্তিনেস ইতিমধ্যে কোকা তুলে কলা ও কাসাভার মতো বৈধ ফসল লাগিয়েছেন। তার মতে, আগে সেনা বা পুলিশ এসে জোর করে ফসল নষ্ট করত, এতে ক্ষোভ বাড়ত এবং মানুষ আবার কোকায় ফিরত। এখন নিজেরাই যখন পরিবর্তন করছে, তখন পরিস্থিতি আলাদা।
কলম্বিয়ায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে। ছয় দশকের গৃহযুদ্ধে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী মাদক পাচারের অর্থে নিজেদের টিকিয়ে রেখেছে। ২০১৬ সালের শান্তিচুক্তির পর কোকা বিকল্প কর্মসূচি চালু হয়, যেখানে স্বেচ্ছায় কোকা ধ্বংসকারীদের নগদ সহায়তা ও কৃষি সহায়তা দেওয়া হয়। পেত্রো ক্ষমতায় এসে এই কর্মসূচিকে আরও গুরুত্ব দিয়েছেন।
এই কর্মসূচির আওতায় সাবেক কোকা চাষিরা কোকো, কলা ইত্যাদি চাষের জন্য চারা ও সার পাচ্ছেন। অনেকেই এখন এসব পণ্য বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন, যদিও শুরুটা ছিল কঠিন।
একই সঙ্গে সরকার মাদক চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। গত নভেম্বর এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় কোকেন জব্দের ঘোষণা দেওয়া হয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, হাজার হাজার কেজি কোকেন জব্দ, অসংখ্য ল্যাব ধ্বংস এবং লাখের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে সমালোচকদের দাবি, এসব পদক্ষেপের পরও কোকা চাষ ও কোকেন উৎপাদন রেকর্ড মাত্রায় রয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে কলম্বিয়ায় কোকা চাষ বেড়েছে এবং সম্ভাব্য কোকেন উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সরকার এই পরিসংখ্যানের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং সেগুলো আর ব্যবহার না করার ঘোষণা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিমাপের সীমাবদ্ধতা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে কোকা চাষ বাড়ার প্রবণতা অস্বীকার করা যায় না। এর প্রধান কারণ বৈশ্বিক চাহিদা, যা উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপ ছাড়িয়ে এশিয়া ও আফ্রিকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন কলম্বিয়াকে কোকেনের উৎসেই থামানোর চাপ দিচ্ছে। গত বছর পেত্রোর বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করে কলম্বিয়াকে মাদকবিরোধী অংশীদার তালিকা থেকেও বাদ দেওয়া হয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন বৈঠকটি নীতির চেয়ে রাজনৈতিক কৌশলের বেশি প্রতিফলন হতে পারে। উভয় পক্ষই নিজেদের জয় দাবি করার সুযোগ খুঁজবে।
দেশের ভেতরেও পেত্রোর নীতি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সামনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, ডানপন্থীরা সরকারকে অপরাধ দমনে দুর্বল প্রমাণ করতে চাইছে। সমালোচকরা বলছেন, দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমাতে আরও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রয়োজন। নিরাপত্তা নীতিতে দুর্বলতার কারণেও কোকা চাষ বেড়েছে বলে অনেকে মনে করেন।
তবুও আওয়া সংরক্ষিত এলাকায় কোকা গাছ উপড়ে ফেলার দৃশ্য অনেকের মনে আশার সঞ্চার করছে। কাইসেদোর ভাষায়, জমিকে ভিন্নভাবে কাজে লাগাতে পারলে শুধু জীবিকাই নয়, সমাজের ক্ষতও ধীরে ধীরে সেরে উঠতে পারে।
















