ভারতে দ্রুত পণ্য পৌঁছানোর প্রতিযোগিতায় কাজ করতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন ডেলিভারি কর্মীরা। এই বাস্তবতায় সরকার কোম্পানিগুলোকে ‘১০ মিনিটে ডেলিভারি’র প্রতিশ্রুতি বন্ধ করতে বললেও মাঠপর্যায়ে কর্মীদের ঝুঁকি কমেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।
দিল্লির উপকণ্ঠের নইডায় এক ব্যস্ত মোড়ে গত বছর অক্টোবরে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ১৮ বছর বয়সী ডেলিভারি কর্মী অঙ্কুশ। পূর্ব বিহার থেকে আসা তরুণটি সেদিনই প্রথম বড় শহরে কাজ শুরু করেছিলেন। দ্রুত পণ্য পৌঁছানোর চাপে ব্যস্ত সড়কে চলতে গিয়ে একটি গাড়ির ধাক্কায় তার মৃত্যু হয়। সহকর্মীরা চাঁদা তুলে তার মরদেহ গ্রামে পাঠান।
ভারতের দ্রুত ডেলিভারি সেবা বিশ্বজুড়ে আলোচিত। খাবার, বাজার, ওষুধ থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা পণ্য অল্প সময়ে পৌঁছে দিচ্ছে এসব প্ল্যাটফর্ম। সুইগি, জোমাটো ছাড়াও জেপ্টো, ফ্লিপকার্ট মিনিটসের মতো প্রতিষ্ঠান এই খাতে যুক্ত হয়েছে। ২০২৪ সালে আমাজনও ১৫ মিনিটে ডেলিভারি সেবা চালু করে।
প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্যেই ১০ মিনিটে ডেলিভারির ঘোষণা দেয়। কিন্তু যানজটে ভরা, খানাখন্দে ভাঙা শহুরে রাস্তায় এই সময়সীমা ডেলিভারি কর্মীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা কর্মক্ষেত্রজনিত মৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত হয় না।
ঝুঁকি শুধু দুর্ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ সময় প্রচণ্ড গরমে কাজ, বিষাক্ত বাতাসে চলাচল এবং গ্রাহকের রেটিংনির্ভর আয়ের ব্যবস্থাও চাপ বাড়াচ্ছে। অসন্তুষ্ট গ্রাহকের বিরুদ্ধে কথা বলার সুযোগ নেই, কারণ এতে রেটিং কমে আয় কমে যেতে পারে।
জানুয়ারির শুরুতে ডেলিভারি কর্মীদের দেশজুড়ে ধর্মঘটের পর সরকার হস্তক্ষেপ করে এবং কোম্পানিগুলোকে ১০ মিনিটে ডেলিভারির প্রতিশ্রুতি না দিতে নির্দেশ দেয়। তবে শ্রমিক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবে খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি। প্রতিযোগিতার কারণে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা থাকুক বা না থাকুক, দ্রুত ডেলিভারির চাপ থেকেই যাচ্ছে।
এক গবেষক বলেন, শহুরে মধ্যবিত্তের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে দরিদ্র কর্মীদের জীবন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। মহামারির পর দ্রুত ডেলিভারি সেবার বিস্তার এই প্রবণতা আরও বাড়িয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ভারতের গিগ অর্থনীতি দ্রুত বাড়ছে। আগামী কয়েক বছরে এই খাতে কর্মীর সংখ্যা কয়েক গুণ বাড়বে। গত অর্থবছরে দ্রুত ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলোর অর্ডারের পরিমাণ ছিল রেকর্ড পরিমাণ।
সরকারের নির্দেশনার পর কোম্পানিগুলো বিজ্ঞাপনে ১০ মিনিটের কথা কম বললেও অ্যাপে এখনো অনেক জায়গায় কম সময়েই ডেলিভারি দেখানো হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত প্রচারণাভিত্তিক পরিবর্তন, ব্যবসার কাঠামোতে বড় কোনো রদবদল হয়নি।
ডেলিভারি কর্মীরা বলছেন, আয় বাড়াতে হলে দ্রুতই চলতে হয়। এক কর্মী জানান, বেশি অর্ডার মানেই বেশি আয়। তাই সিগন্যাল ভাঙা, উল্টো পথে চালানো—সবই করতে হয়।
সরকার নতুন শ্রম আইন এনে প্রথমবারের মতো গিগ কর্মীদের স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলছে। পেনশন, দুর্ঘটনা বিমার মতো সামাজিক নিরাপত্তার পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে কর্মীদের অভিযোগ, এসব এখনো কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে।
কর্মীরা বলছেন, দাবি আদায়ে একমাত্র উপায় একজোট হওয়া। নতুন বছরের আগের দিন ধর্মঘটে হাজারো ডেলিভারি কর্মী কাজ বন্ধ রাখেন। সংগঠনগুলোর দাবি, কোম্পানির অ্যালগরিদম স্বচ্ছ করতে হবে, ইচ্ছামতো কর্মী আইডি বন্ধ করা বন্ধ করতে হবে এবং প্রতিবাদের অধিকার দিতে হবে।
অনেক কর্মীর অভিযোগ, কম রেটিং বা অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো নোটিশ ছাড়াই অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা কার্যত চাকরিচ্যুতি। আহত অবস্থাতেও কাজ করতে বাধ্য হন অনেকে, কারণ বিরতি নিলে প্রণোদনা হারানোর আশঙ্কা থাকে।
এক ডেলিভারি কর্মী বলেন, কোম্পানির কাছে তারা যেন কেবল বাইকের ওপর বসানো যন্ত্র। একজন পড়ে গেলে আরেকজন আসবে—এই মানসিকতাই কাজ করছে।
















