১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সাথেই হবে গণভোট; জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ৪টি মূল প্রশ্নে জনমত যাচাই
আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণভোট। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই ভোটাররা নির্ধারণ করবেন ‘জুলাই সনদ’ বা রাষ্ট্র সংস্কারের ৮৪টি প্রস্তাবনা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে কি না। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। যদি ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়, তবে আগামী সংসদ নয় মাসের মধ্যে সংবিধানের আমূল পরিবর্তন আনতে বাধ্য থাকবে। অন্যথায় জুলাই সনদটি অকার্যকর হয়ে যাবে।
২৬ জানুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সনদে ৪৭টি সাংবিধানিক এবং ৩৭টি প্রশাসনিক সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো যুগান্তকারী পরিবর্তনগুলো অন্তর্ভুক্ত। তবে বিএনপি ও জামায়াতসহ কয়েকটি দল কিছু নির্দিষ্ট পয়েন্টে ভিন্নমত (Note of Dissent) পোষণ করেছে। ভোটারদের সুবিধার্থে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে সম্ভাব্য প্রধান পরিবর্তনগুলো নিচে তুলে ধরা হলো।
১. জাতীয় পরিচয় ও রাষ্ট্রীয় মূলনীতি
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে বাংলাদেশের মানুষের জাতীয় পরিচয়ে পরিবর্তন আসবে এবং রাষ্ট্রীয় মূলনীতিগুলো নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হবে।
- জাতীয় পরিচয়: নাগরিকদের পরিচয় ‘বাঙালি’র পরিবর্তে হবে ‘বাংলাদেশি’।
- ভাষা: রাষ্ট্রভাষা বাংলা থাকবে, তবে অন্য সব মাতৃভাষার স্বীকৃতি সংবিধানে যুক্ত হবে।
- মূলনীতি: বর্তমানের ৪টি মূলনীতির স্থলে নতুন ৫টি মূলনীতি হবে— সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি।
- মৌলিক অধিকার: নতুন করে নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা মৌলিক অধিকার হিসেবে যুক্ত হবে।
২. রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও ভারসাম্য
ক্ষমতার কেন্দ্রীভূতকরণ রোধে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও মেয়াদের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে।
| বিষয় | বিদ্যমান ব্যবস্থা (বর্তমান) | জুলাই সনদ (হ্যাঁ জিতলে) |
| প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ | অনির্দিষ্টকাল থাকতে পারেন। | এক ব্যক্তি জীবনে ১০ বছরের বেশি (২ মেয়াদ) থাকতে পারবেন না। |
| একাধিক পদ | প্রধানমন্ত্রী দলীয় ও রাষ্ট্রীয় একাধিক পদে থাকতে পারেন। | প্রধানমন্ত্রী একাধিক পদে থাকতে পারবেন না। |
| জরুরি অবস্থা | প্রধানমন্ত্রীর একক স্বাক্ষরে জারি হয়। | মন্ত্রিসভার অনুমোদন ও বিরোধী দলের উপস্থিতি লাগবে। |
| রাষ্ট্রপতি নির্বাচন | এমপিদের প্রকাশ্যে ভোটে নির্বাচিত হন। | উচ্চ ও নিম্নকক্ষের সদস্যদের গোপন ব্যালটে নির্বাচিত হবেন। |
| ক্ষমা প্রদর্শন | সরকার চাইলে যে কাউকে ক্ষমা করতে পারেন। | কেবল ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সম্মতি থাকলে ক্ষমা করা যাবে। |
৩. সংসদ ও সরকার কাঠামো
সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে এক কক্ষের পরিবর্তে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদের প্রস্তাব করা হয়েছে।
- দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ: সংসদে উচ্চকক্ষ (১০০ আসন) এবং নিম্নকক্ষ থাকবে। উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন হবে প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে।
- তত্ত্বাবধায়ক সরকার: সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে।
- সংরক্ষিত নারী আসন: বর্তমানের ৫০টি আসন ক্রমান্বয়ে ১০০-তে উন্নীত করা হবে।
- বিরোধী দলের ভূমিকা: ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন বিরোধী দল থেকে।
- ভোটের স্বাধীনতা: বাজেট ও আস্থাবিল ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে এমপিরা দলের বাইরে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন।
৪. বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশন
বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করার এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
- বিচারপতি নিয়োগ: প্রধান বিচারপতি নিয়োগ হবে সরাসরি আপিল বিভাগ থেকে। হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিশনের ক্ষমতা থাকবে।
- নির্বাচন কমিশন গঠন: প্রধানমন্ত্রীর একক ইচ্ছার পরিবর্তে স্পিকারের সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতার সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে ইসি গঠিত হবে।
- ন্যায়পাল: দীর্ঘদিনের দাবি মেনে ন্যায়পাল (Ombudsman) নিয়োগের জন্য উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হবে।
- হাইকোর্ট বেঞ্চ: বিচারপ্রার্থীদের সুবিধার্থে দেশের প্রতিটি বিভাগে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপন করা হবে।
৫. প্রশাসনিক সংস্কার ও নতুন বিভাগ
সংবিধানের বাইরেও ৩৭টি আইন ও প্রশাসনিক সংস্কার করা হবে।
- নতুন বিভাগ: ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে দুইটি নতুন প্রশাসনিক বিভাগ গঠন করা হবে।
- সম্পত্তির হিসাব: সকল সরকারি কর্মচারী ও বিচারকদের প্রতিবছর সম্পত্তির বিবরণী প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হবে।
- তদন্ত সংস্থা: পুলিশের অধীনে নয়, বরং বিচার বিভাগীয় সহায়তার জন্য স্বতন্ত্র ফৌজদারি তদন্ত সার্ভিস গঠন করা হবে।











