প্রাণীজগতের অনেক সমাজেই স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব দেখা যায়, যেখানে শক্তিশালী একটি সদস্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। আবার কিছু প্রজাতির সমাজ তুলনামূলকভাবে সমতাভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক কাঠামো মানুষের সমাজ ও স্বৈরশাসন বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিতে পারে।
বিশ শতকে মানুষের ইতিহাসে যেমন বহু স্বৈরশাসকের আবির্ভাব হয়েছিল, তেমনি প্রাণী সমাজেও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ একটি পরিচিত বিষয়। গত শতকের পঞ্চাশের দশকে ব্রিটিশ গবেষক পিটার ক্রাউক্রফট ইঁদুরের আচরণ নিয়ে গবেষণার সময় একটি ইঁদুরের মধ্যে ভয়ংকর আধিপত্যবাদী আচরণ লক্ষ্য করেন। তিনি এই ইঁদুরটির নাম দেন বিল। অন্য ইঁদুরদের ওপর বিলের নিষ্ঠুর দমন-পীড়ন গবেষকদের চোখে এক ধরনের স্বৈরতন্ত্রের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
এই ধরনের আধিপত্যবাদী আচরণ শুধু ইঁদুরেই সীমাবদ্ধ নয়। বাবুন, খোঁজকাটা ইঁদুর, ন্যাংটো তিল ইঁদুরসহ বহু প্রাণীর সমাজেই ক্ষমতার স্তরবিন্যাস দেখা যায়। এসব সমাজে শীর্ষে থাকা সদস্যরা খাদ্য, সঙ্গী ও চলাফেরার সিদ্ধান্তে প্রাধান্য পায় এবং পুরো দলের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে।
গবেষকদের মতে, যখন কোনো প্রাণী গোষ্ঠীর সদস্যদের অন্যত্র চলে যাওয়ার সুযোগ কম থাকে, তখন স্বৈরশাসন আরও শক্তিশালী হয়। মানুষের ইতিহাসেও এমন পরিস্থিতিতে স্বৈরতন্ত্র টিকে থাকার উদাহরণ রয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে পরিবেশগত পরিবর্তন বা অভ্যন্তরীণ ঘটনার ফলে এই ধরনের নেতৃত্ব ভেঙেও পড়তে পারে।
ব্রাজিলের উত্তরাঞ্চলে বসবাসকারী নর্দার্ন মুরিকুই নামের বানর প্রজাতিকে পৃথিবীর সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ প্রাইমেট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এদের সমাজে কোনো একক শাসক নেই। খাদ্য ভাগাভাগি, সহনশীলতা ও ধৈর্য তাদের সামাজিক জীবনের মূল বৈশিষ্ট্য। গবেষকদের মতে, এ ধরনের সমাজ দেখায় যে সহিংসতা ও আধিপত্য ছাড়াও দলগত জীবন সম্ভব।
আবার দক্ষিণ আফ্রিকার কিছু বাবুন সমাজে দেখা গেছে, শীর্ষ পুরুষ ও নারী সদস্যরা আক্রমণাত্মক আচরণের মাধ্যমে নিজেদের ক্ষমতা বজায় রাখে। কখনো কখনো এই দমন-পীড়নের ফল মারাত্মক হয়, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। তবে ব্যতিক্রমও আছে, যেখানে ক্ষমতাসীন সদস্য তুলনামূলক সংযম দেখায়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সম্পদের অসম বণ্টন স্বৈরতন্ত্রের জন্ম দিতে পারে। যখন খাদ্য বা নিরাপত্তা সীমিত থাকে, তখন কিছু সদস্য তা দখলে রেখে অন্যদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে। মানুষের সমাজেও ইতিহাসজুড়ে একই প্রবণতা দেখা গেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে প্রাণীজগতে স্বৈরতন্ত্র সবসময় স্থায়ী হয় না। এক ধরনের পিঁপড়ার সমাজে দেখা গেছে, দাসত্বে আবদ্ধ পিঁপড়ারা একত্রিত হয়ে শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। এতে বোঝা যায়, চরম দমন-পীড়ন শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ ডেকে আনতে পারে।
গবেষকদের মতে, প্রাণী সমাজ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মানুষ নিজেদের আচরণ ও সামাজিক কাঠামো নতুনভাবে বুঝতে পারে। সহযোগিতা, সহনশীলতা ও সমতার চর্চা একটি সমাজকে দীর্ঘমেয়াদে বেশি স্থিতিশীল করে তুলতে পারে। নর্দার্ন মুরিকুইদের মতো শান্তিপূর্ণ সমাজ বিজ্ঞানীদের অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে, যা দেখায় যে শক্তি নয়, বরং সহযোগিতাই টিকে থাকার সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রাণীজগতের এসব উদাহরণ মানুষের জন্য সরাসরি নির্দেশনা না হলেও, এগুলো আমাদের ভাবতে শেখায়—স্বৈরশাসনের বিকল্প হিসেবে সহাবস্থান ও সমতার পথ বেছে নেওয়া কি সম্ভব নয়।
















