পশ্চিম আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার নামে সামরিক কার্যক্রম ও জোট গঠনের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা, প্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক জোট এবং ভিন্ন ভিন্ন বিদেশি শক্তির সমর্থনে অঞ্চলটি নতুন করে নিরাপত্তা সংকট ও সংঘাতের ঝুঁকির দিকে এগোচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন।
গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে নাইজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভয়াবহ বিমান হামলার ঘোষণা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও হামলার হুঁশিয়ারি দেন। এর এক সপ্তাহ আগেই মালি, বুরকিনা ফাসো ও নাইজারের সামরিক নেতৃত্বের উদ্যোগে গঠিত সাহেল রাষ্ট্র জোট পাঁচ হাজার সদস্যের একটি যৌথ সামরিক বাহিনী চালু করে। একই সময়ে পশ্চিম আফ্রিকার আঞ্চলিক জোট ইকোওয়াস সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের জন্য দুই লাখ ষাট হাজার সদস্যের বিশাল বাহিনী গঠনের পরিকল্পনা ঘোষণা করে।
সমর্থকদের দাবি, এসব উদ্যোগ সন্ত্রাস দমনে কার্যকর পদক্ষেপ। তবে বাস্তবে কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরতা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে পরাস্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে মত বিশ্লেষকদের। বরং এতে অঞ্চলজুড়ে সামরিকীকরণ আরও তীব্র হচ্ছে, বাড়ছে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কা।
২০২১ সালের আগে পর্যন্ত সাহেলে সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম পরিচালিত হতো তুলনামূলক সমন্বিত নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে। এতে আঞ্চলিক সংগঠন, আফ্রিকান ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতা ছিল। তবে ২০২৩ সালে নাইজারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। সাংবিধানিক শাসন ফিরিয়ে আনতে বলপ্রয়োগের হুমকি দেওয়ায় ইকোওয়াসকে শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয় নাইজারের সামরিক সরকারের মধ্যে।
এর প্রতিক্রিয়ায় নাইজার, মালি ও বুরকিনা ফাসো একত্রে সাহেল রাষ্ট্র জোট গঠন করে এবং পশ্চিমা দেশ ও ইকোওয়াসের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা ছিন্ন করার পথে হাঁটে। এই জোট নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার নামে ইকোওয়াস ও তার পশ্চিমা মিত্রদের হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে, যা পশ্চিম আফ্রিকায় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামো থেকে সরে এসে সাহেল রাষ্ট্র জোট রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের প্রভাবের বিপরীতে নতুন মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে। নাইজেরিয়ার সামরিক ভূমিকা নিয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এই উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে। নাইজেরিয়ার বিমান বুরকিনা ফাসোর আকাশসীমায় অবতরণ করাকে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে সাহেল রাষ্ট্র জোট।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নাইজেরিয়ার নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার হওয়ায় সাহেল রাষ্ট্র জোট উদ্বিগ্ন। ভবিষ্যতে ইকোওয়াস বাহিনীর অভিযান সাহেল অঞ্চলের কাছাকাছি হলে উভয় পক্ষের বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সীমান্তের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও জটিল যুদ্ধপরিস্থিতি এই আশঙ্কা আরও বাড়াচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাহেল রাষ্ট্র জোট ও ইকোওয়াসের মধ্যে সমঝোতা না হলে পশ্চিম আফ্রিকা দুটি বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে। একদিকে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত শুরু হতে পারে, অন্যদিকে অঞ্চলটি বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতার নতুন মঞ্চে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সন্ত্রাসবাদ দমনের লক্ষ্য ব্যাহত হবে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।
এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামরিক শক্তির পাশাপাশি মানবিক নিরাপত্তা, রাজনৈতিক সংলাপ ও আঞ্চলিক সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার না দিলে সাহেল অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কেবল অস্ত্র ও বাহিনী বাড়িয়ে নয়, বরং আস্থা ও কূটনীতির মাধ্যমে সংকট সমাধানের পথ খোঁজার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।
















