কক্সবাজারের পরিবেশ রক্ষা, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ১৯ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে একটি বিশেষ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কোস্ট ফাউন্ডেশন ও প্রথম আলোর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই বৈঠকে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি, পরিবেশবিদ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। আলোচনায় উঠে এসেছে কক্সবাজারের অমিত সম্ভাবনা এবং সেই সাথে বিদ্যমান গভীর সংকটগুলো।
১. ভৌগোলিক গুরুত্ব ও বৈশ্বিক সম্ভাবনা
কক্সবাজার কেবল বাংলাদেশের একটি জেলা নয়, বরং আসিয়ান ও সার্কভুক্ত দেশগুলোর সংযোগস্থল।
- আন্তর্জাতিক হাব: কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পূর্ণাঙ্গ চালু হলে এটি দুবাই বা দোহার মতো বৈশ্বিক যোগাযোগ হাবে পরিণত হতে পারে।
- গভীর সমুদ্রবন্দর: চট্টগ্রামের চেয়ে বেশি ড্রাফট থাকায় এখানকার সমুদ্রবন্দর ভবিষ্যতে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হবে।
- আঞ্চলিক সংযোগ: মিয়ানমার সংকটের সমাধান হলে রেল ও সড়কপথ চীন পর্যন্ত সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২. প্রধান চ্যালেঞ্জ ও সংকটসমূহ
উন্নয়নের আড়ালে কক্সবাজার আজ বহুমুখী সমস্যার সম্মুখীন:
- অপরিকল্পিত নগরায়ণ: ৫৪ বছরেও কোনো কার্যকর মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে যানজট ও বিশৃঙ্খলা চরমে পৌঁছেছে।
- পরিবেশ বিপর্যয়: পাহাড় নিধন, প্যারাবন ধ্বংস এবং বালিয়াড়ি দখল পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে।
- মিঠাপানির সংকট: অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে লবণাক্ততা বাড়ছে। কয়েক বছরের মধ্যে তীব্র সুপেয় পানির অভাব দেখা দিতে পারে।
- রোহিঙ্গা সংকট: উখিয়া-টেকনাফ এলাকায় রোহিঙ্গাদের চাপে স্থানীয়রা কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
- বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: কেন্দ্রীয় সুয়ারেজ সিস্টেম না থাকায় বর্জ্য সরাসরি সাগরে মিশছে, ফলে সাগরের নীল পানি ঘোলা হয়ে যাচ্ছে।
৩. বিশেষজ্ঞ ও নেতৃবৃন্দের প্রস্তাবনা
| আলোচক | মূল প্রস্তাবনা |
| লুৎফুর রহমান কাজল (বিএনপি) | ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা কাজে লাগানো এবং ১০০ কিমি সৈকতের পরিকল্পিত উন্নয়ন। |
| আবদুল্লাহ আল ফারুক (জামায়াত) | চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীত করা এবং রাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। |
| শাহজাহান চৌধুরী (বিএনপি) | কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। |
| রেজাউল করিম চৌধুরী (কোস্ট) | কৃষিজমি রক্ষা এবং সরকারি গেস্টহাউসগুলোকে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দেওয়া। |
| খন্দকার মাহমুদ পাশা (পরিবেশ) | সেন্ট মার্টিন ও সোনাদিয়ার মতো ইকোলজিক্যাল এরিয়াগুলোকে কঠোরভাবে রক্ষা করা। |
৪. টেকসই উন্নয়নের পথনকশা (সুপারিশসমূহ)
১. পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান: কক্সবাজার শহর থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত ১২০ কিমি সৈকতের জন্য একটি বাধ্যতামূলক মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন।
২. বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা: দ্রুত সেন্ট্রাল এসটিপি (STP) স্থাপন এবং সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে পানির চাহিদা পূরণ।
৩. পর্যটন বৈচিত্র্য: কেবল সমুদ্র দেখা নয়, বরং কেব্ল কার, অ্যামিউজমেন্ট পার্ক এবং ইকো-ট্যুরিজম সম্প্রসারণ।
৪. দক্ষতা বৃদ্ধি: স্থানীয় ২০ লাখ মানুষকে পর্যটন ও হসপিটালিটি সেক্টরে দক্ষ করতে বিশেষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন।
৫. নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: পর্যটকদের জন্য ওশান রেসকিউ সিস্টেম এবং ট্যুরিস্ট পুলিশের জনবল বৃদ্ধি।
কক্সবাজারের উন্নয়ন মানে কেবল দালানকোঠা নির্মাণ নয়; এটি হতে হবে পরিবেশবান্ধব ও জনমুখী। মাস্টারপ্ল্যান যদি কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই পর্যটন নগরী বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। পরিবেশ ও জীবিকার ভারসাম্য রক্ষাই হবে আগামীর মূল সার্থকতা।
















