বৈশ্বিক শক্তির দ্বন্দ্বে ভাঙছে নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা, বড় ঝুঁকিতে উন্নয়নশীল দেশগুলো
আমাদের মনোযোগ এখন আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে। সেটাই স্বাভাবিক। একটি নির্বাচিত ও জবাবদিহিমূলক সরকারের প্রত্যাশায় দেশ নতুন করে গণতন্ত্রের পথে ফেরার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু একই সময়ে বিশ্বের দৃষ্টি অন্যদিকে—বিদ্যমান বৈশ্বিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন অথবা অন্তত বর্তমান বাস্তবতার চেয়ে গ্রহণযোগ্য কোনো কাঠামোর খোঁজে।
পূর্ব ইউরোপে রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসন এবং পশ্চিমে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ নেওয়ার হুমকি শীতল যুদ্ধ–পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে ইউরোপ। রাশিয়ার আগ্রাসনের জন্য ইউরোপ হয়তো প্রস্তুত ছিল, কিন্তু যিনি দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত মিত্র—সেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেই হুমকি আসবে, তা ইউরোপ কল্পনাও করেনি।
সম্প্রতি দাভোসে বক্তব্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলে বলপ্রয়োগ না করার কথা বললেও দাবি থেকে সরে আসেননি। এতে ইউরোপের উদ্বেগ সাময়িকভাবে কিছুটা কমলেও ট্রান্সআটলান্টিক জোটের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আরও গভীর হয়েছে।
এর আগে হঠাৎ শুল্ক আরোপ, ইউক্রেন সংকটে রাশিয়ার প্রতি নরম অবস্থান এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য হওয়ার ‘প্রস্তাব’ পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে আস্থার বড় ধরনের ভাঙন তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাণিজ্যে বহুমুখীকরণের কথা বলছে—যা দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক বড় মোড়।
ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাতা দেশ হয়েও যুক্তরাষ্ট্র যখন ডেনমার্কের অধীন গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা দাবি করে, তখন আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি—জাতীয় সার্বভৌমত্ব—গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। জাতিসংঘ সনদে রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম সমতার যে নীতি স্বীকৃত, তা কার্যত প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।
রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসন, ভেনেজুয়েলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপমূলক বক্তব্য এবং গ্রিনল্যান্ড ইস্যু—সব মিলিয়ে বিশ্ব আবার ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতির দিকে এগোচ্ছে কি না, সেই আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে। নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পতন মানে কেবল কূটনৈতিক অস্থিরতা নয়; বরং সভ্যতার অস্তিত্বের ওপরই হুমকি।
এই বৈশ্বিক উত্তেজনার প্রভাব বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন—এই দুই পক্ষই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রধান বাজার। রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। তাদের মধ্যে বাণিজ্য বিরোধ, শুল্কযুদ্ধ বা সামরিক উত্তেজনা শুরু হলে তার প্রথম আঘাত পড়বে আমাদের অর্থনীতিতে।
নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে আমাদের মতো দেশগুলোকে খেয়ালখুশিমতো শুল্ক, মূল্যচাপ কিংবা রাজনৈতিক শর্তের মুখে পড়তে হতে পারে। এমনকি ভূরাজনৈতিক পক্ষ বেছে নেওয়ার চাপও আসতে পারে। ইন্দো–প্যাসিফিক অঞ্চল, বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগর ঘিরে শক্তির লড়াই আমাদের পররাষ্ট্রনীতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে কেবল অস্ত্র ব্যবসায়ীরাই লাভবান হচ্ছে। ইউরোপ ও এশিয়াজুড়ে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের মতো মানবসভ্যতার অস্তিত্ব সংকট মোকাবিলার বদলে বিশ্ব এগোচ্ছে সমরসজ্জার পথে। এটি যে ভুল নীতি—তা ইতিহাস বহুবার প্রমাণ করেছে।
গ্রিনল্যান্ড ভৌগোলিকভাবে আমাদের থেকে দূরে হলেও ভূরাজনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব একেবারেই নিকটবর্তী। নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা আমাদের মতো দেশের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন। এই সত্য ভুলে গেলে ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে।















