আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি এক সপ্তাহের সফরে ভারতে পৌঁছেছেন—এক সময় যা অকল্পনীয় ছিল। ২০২১ সালে আশরাফ গনির সরকার পতনের পর তালেবানের শাসন ফিরে আসে, আর তখন থেকে এটাই তালেবানের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কোনো প্রতিনিধির প্রথম ভারত সফর।
মুত্তাকি তাঁর আট দিনের সফরে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে আলোচনা করবেন। শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকের পর নয়াদিল্লি ঘোষণা করেছে, তারা কাবুলে তাদের দূতাবাস পুনরায় খুলবে—যা ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
এই ঘটনাকে ভারত-আফগান সম্পর্কের নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে, ঐতিহাসিকভাবে তালেবানের ঘনিষ্ঠ মিত্র পাকিস্তান পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা থেকে সাময়িক ছাড় পেয়ে মুত্তাকি রাশিয়া হয়ে দিল্লিতে পৌঁছেছেন। রাশিয়াই এখন পর্যন্ত একমাত্র দেশ, যারা আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চার বছর আগেও কেউ ভাবতে পারেনি তালেবান ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন হবে, আর পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের দূরত্ব এতটা বাড়বে। এক সময় যে আফগান সরকারকে ভারত সমর্থন দিত, সেই সরকারকেই ক্ষমতা থেকে সরিয়েছিল তালেবান। তবু বাস্তব রাজনীতি ও কৌশলগত দূরদর্শিতা দুই দেশকে একসঙ্গে টানছে।
বৈঠকের সময় জয়শঙ্কর বলেন, “আমাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা আফগানিস্তানের জাতীয় উন্নয়ন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখবে।” মুত্তাকি ভারতকে “ঘনিষ্ঠ বন্ধু” উল্লেখ করে বলেন, এই সফর দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর করবে। সফররত আফগান প্রতিনিধি দল ভারতের ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গেও বৈঠক করবে বলে জানা গেছে।
যদিও ভারত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি, তবু কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রেখেছে। বর্তমানে কাবুলে ভারতের একটি ছোট প্রতিনিধি দল অবস্থান করছে এবং দেশটি নিয়মিত মানবিক সহায়তা পাঠাচ্ছে। মোদি সরকারের সঙ্গে তালেবানের যোগাযোগ শুরু হয় ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার কিছুদিন পর থেকেই।
বিশ্লেষক হার্শ ভি পান্ত ও শিভম শেখাওয়াত মনে করেন, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ায় তালেবান এখন বিকল্প মিত্র খুঁজছে এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে নিজেদের স্বাধীন পরিচয় তৈরি করতে চাইছে। তাঁদের মতে, ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তালেবানকে আফগান জনগণের কাছে ‘বৈধতার ধারণা’ তৈরিতে সাহায্য করছে।
ভারতের কৌশলগত বিশ্লেষক ব্রহ্ম চেলানি বলেছেন, এই সফর পাকিস্তানের জন্য “এক ধরনের ধাক্কা” এবং তালেবান সরকারের কার্যত স্বীকৃতির পথে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তাঁর মতে, ভারত-তালেবান সম্পর্ক এখন কৌশলগত বাস্তববাদের ওপর ভিত্তি করে পুনর্গঠিত হচ্ছে, যা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০২১ সালে তালেবানের কাবুল দখলের পর ভারত দ্রুত তার দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলো বন্ধ করে দেয় এবং আফগান নাগরিকদের ভিসা বাতিল করে। তবে এক বছরের মধ্যেই তারা আবার কূটনৈতিক কার্যক্রম শুরু করে। ২০২২ সালে কাবুলে মানবিক সহায়তা তদারকির জন্য ভারত একটি ‘কারিগরি দল’ পাঠায়। এরপর তালেবান কর্মকর্তাদের ভিসা দেওয়া শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে পারস্পরিক আস্থা গড়ে ওঠে।
২০২৪ সালের নভেম্বরে ভারত তালেবানকে দিল্লিতে প্রতিনিধি নিয়োগের অনুমতি দেয় এবং মুম্বাই ও হায়দরাবাদে কনস্যুলেট খোলার সুযোগ দেয়। গত তিন বছরে ভারতীয় কূটনীতিকেরা বিদেশে তালেবান নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকও করেছেন।
আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে ভারত ও পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে প্রতিদ্বন্দ্বী। পাকিস্তান তালেবানকে তার কৌশলগত প্রতিনিধি হিসেবে ব্যবহার করেছে, আর ভারত রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে মিলে তালেবানবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর পাশে থেকেছে। কিন্তু বর্তমানে পাকিস্তান-তালেবান সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। ইসলামাবাদ অভিযোগ করছে, আফগানিস্তান পাকিস্তানি তালেবানকে (টিটিপি) তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে হামলার সুযোগ দিচ্ছে, যার জবাবে পাকিস্তান আফগান সীমান্তে বিমান হামলা চালিয়েছে।
অন্যদিকে, তালেবান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, পাকিস্তানের কিছু মহল আফগানিস্তানকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।
ভারতের দৃষ্টিতে তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা কৌশলগত প্রয়োজন। তাদের প্রধান উদ্বেগ নিরাপত্তা—বিশেষ করে আইএস, আল–কায়েদা ও ভারতকেন্দ্রিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর কার্যক্রম। তালেবান প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তারা আফগান ভূখণ্ড ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসে ব্যবহার করতে দেবে না।
এ সম্পর্ক ভারতের জন্য আঞ্চলিক রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ। ইরান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ জোরদার করা এবং চীন–পাকিস্তানের প্রভাব মোকাবিলায় এটি একটি নতুন কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সম্পর্ক যতই এগোক, উভয় পক্ষ এখনো সতর্ক ও সীমিত পরিসরে এগোচ্ছে—অতীত অভিজ্ঞতা ও আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়ার কারণে সম্পর্কের এই নতুন অধ্যায় এখনো প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে।
















