এআই অপব্যবহার ও সংগঠিত অনলাইন হয়রানিতে হুমকির মুখে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব
জুলাই বিপ্লব–পরবর্তী বাংলাদেশে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ার আশার মধ্যেই উদীয়মান নারী নেত্রীরা ভয়াবহ সাইবার সন্ত্রাস, চরিত্রহনন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)–নির্ভর অপপ্রচারের শিকার হচ্ছেন।
ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, সর্বশেষ জুলাই বিপ্লব—বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক বাঁকবদলে নারীরা ছিলেন অগ্রভাগে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনীতিতে আসা নতুন প্রজন্মের নারীনেত্রীদের জন্য মাঠের লড়াইয়ের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সংগঠিত সাইবার বুলিং, যৌন হয়রানি ও এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট।
নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দলের নারী প্রার্থীদের লক্ষ্য করে আপত্তিকর প্রচার, অপপ্রচার ও হুমকির মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। একাধিক নারী প্রতিদ্বন্দ্বী অভিযোগ করেছেন, পরিকল্পিতভাবে তাদের কণ্ঠ রোধ ও রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতেই এই সাইবার আক্রমণ চালানো হচ্ছে।
তরুণ জুলাইযোদ্ধাদের নিয়ে গঠিত রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)-র সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনীতিতে আসা তরুণ নারীনেত্রীরা অভূতপূর্ব ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই ব্যবহার করে ভুয়া ভিডিও, বিকৃত বক্তব্য ও বিভ্রান্তিকর ন্যারেটিভ ছড়ানো হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি জানান, এনসিপির ধানমন্ডি থানার যুগ্ম আহ্বায়ক জান্নাত আরা রুমিকে ফোনে গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে থানায় অভিযোগ জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা না পাওয়ার হতাশার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মহুয়া ও সুইটি আক্তার জানান, ক্যাম্পাস রাজনীতিতে সক্রিয় নারী শিক্ষার্থীরাও নিয়মিত সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। তাদের মতে, নারী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ট্যাগিং ও অপপ্রচারের প্রবণতা এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
ঝালকাঠি-১ আসনে এনসিপির প্রার্থী মাহমুদা মিতু বলেন, অনলাইন হয়রানি তার দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুয়া তথ্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ এমনকি এআই দিয়ে তৈরি অশ্লীল ছবিও ছড়ানো হচ্ছে তার বিরুদ্ধে। তিনি মনে করেন, এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং রাজনীতি থেকে নারীদের সরিয়ে দেওয়ার সুপরিকল্পিত কৌশল।
একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আপ বাংলাদেশ-এর মুখপাত্র শাহরিন সুলতানা ইরা। তার ভাষায়, পুরুষ রাজনীতিকদের সমালোচনা যেখানে কাজকেন্দ্রিক থাকে, সেখানে নারীদের ক্ষেত্রে আক্রমণ নেমে আসে চরিত্র ও ব্যক্তিজীবনে। প্রযুক্তির কারণে এই নিপীড়ন এখন আরও ভয়াবহ হয়েছে।
নাটোর-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল ও ঢাকা-১৪ আসনের প্রার্থী সানজিদা তুলি দাবি করেন, বট অ্যাকাউন্ট ও নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নারীদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত সাইবার আক্রমণ চালানো হচ্ছে। দোষীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তারা।
গত ১৩ জানুয়ারি শিশু একাডেমিতে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা অনলাইন হয়রানির শিকারদের জন্য ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ সেবাব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে এআই–নির্ভর ভুয়া কনটেন্ট ঠেকাতে মেটা ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর জোর দেন তিনি।
পরিসংখ্যানও পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত UN Women–এর প্রতিবেদনে দেখা যায়, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ৬৬ শতাংশ নারী অনলাইনে অশালীন বা হুমকিমূলক বার্তা পেয়েছেন। পুলিশের সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন ইউনিট জানায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬০ হাজারের বেশি নারী সাইবার অপরাধের শিকার হয়ে সহায়তা চেয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নারী প্রার্থীর হার ছিল ৪.৮৬ শতাংশ, যা ২০২৬ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৩.৭ শতাংশে। বিশ্লেষকদের মতে, অনিরাপদ অনলাইন ও রাজনৈতিক পরিবেশ নারীদের নির্বাচনমুখী অংশগ্রহণ কমিয়ে দিচ্ছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিআইজি তাপতুন নাসরিন বলেন, নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ইতিবাচক। যারা হুমকি ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে এ পথ রোধ করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ নীতিতে নারীবান্ধব সংস্কার, দ্রুত আইনি পদক্ষেপ এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে জুলাই বিপ্লব–পরবর্তী বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।
















