লন্ডনে বসবাসরত এক ইউক্রেনীয় নারী আন্না নিয়মিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট ব্যবহার করেন। তিনি জানেন এটি একটি যন্ত্র, তবু তার কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে এবং কোনো বিচার করে না। আন্নার মতে, এই চ্যাটবটের সবচেয়ে বড় সুবিধা পরামর্শ নয়, বরং নিজের অনুভূতি ও চিন্তা গুছিয়ে নেওয়ার জন্য নিরবচ্ছিন্ন জায়গা দেওয়া।
সম্প্রতি প্রেমিকের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তিনি দেখেছেন, বন্ধু ও পরিবারের তাৎক্ষণিক মতামত বা বিচার তাকে আরও বিভ্রান্ত করেছে। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো পক্ষ না নিয়ে তাকে নিজের অনুভূতি বিশ্লেষণের সুযোগ দিয়েছে। এই অভিজ্ঞতা শুধু আন্নার নয়। হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে সাধারণ ব্যবহার ছিল থেরাপি ও সঙ্গ দেওয়ার কাজে।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি উত্তর মানুষকে বেশি সহানুভূতিশীল মনে হয়েছে, এমনকি প্রশিক্ষিত সংকট-পরামর্শদাতাদের তুলনায়ও। এর অর্থ এই নয় যে যন্ত্র মানুষের চেয়ে বেশি সহমর্মী, বরং এটি দেখায় আমরা মানুষ হিসেবে কত কম সময় মনোযোগ দিয়ে, বিচারহীনভাবে শুনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আসলে আবেগ অনুভব করে না, বরং বিপুল তথ্যভান্ডার থেকে শেখা ভাষা ও কাঠামোর মাধ্যমে সহানুভূতির অনুকরণ করে। তবু এই অনুকরণ আমাদের নিজের শোনার সীমাবদ্ধতাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের কী শেখাতে পারে। প্রথমত, কথা বলার সময় অন্যকে বারবার বাধা না দেওয়া। মানুষ নানা কারণে কথা কেটে দেয়, কিন্তু এতে বক্তার ভাবনা প্রকাশের সুযোগ নষ্ট হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কখনো তাড়া দেয় না বা বিরক্ত হয় না।
দ্বিতীয়ত, আবেগ চিহ্নিত করা। মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, অনুভূতিকে স্বীকার করা ভালোভাবে শোনার মূল চাবিকাঠি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দুঃখ, ভয় বা হতাশার মতো আবেগ শনাক্ত করে সেগুলো প্রতিফলিত করতে পারে, ফলে ব্যবহারকারী নিজেকে বোঝা হয়েছে বলে অনুভব করেন।
তৃতীয়ত, কঠিন আবেগের জন্য জায়গা করে দেওয়া। মানুষ প্রায়ই অন্যের কষ্ট হালকা করতে তড়িঘড়ি আশ্বাস দেয়, কিন্তু এতে প্রকৃত অনুভূতি উপেক্ষিত থেকে যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই আবেগ এড়িয়ে যায় না, বরং সেগুলো প্রকাশের সুযোগ দেয়।
এছাড়া বিচারহীন উপস্থিতি, নিজের গল্প জুড়ে না দেওয়া এবং সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে না ছোটা—এসব ক্ষেত্রেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আচরণ মানুষকে শিক্ষা দিতে পারে। কারণ যন্ত্রের কোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নেই, তাই কথোপকথনের কেন্দ্রবিন্দু থাকে বক্তাই।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। এটি ভুল বা ক্ষতিকর পরামর্শ দিতে পারে এবং মানুষকে বাস্তব সামাজিক সম্পর্ক থেকে দূরে সরিয়ে নিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে মানুষ যন্ত্রের নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, যা বাস্তব জীবনে সম্ভব নয়।
মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের বিকল্প কোনো যন্ত্র হতে পারে না। একজন মানুষ যখন সচেতনভাবে সময় বের করে আরেকজনের কথা শোনে, তখন যে সম্পর্ক, সহমর্মিতা ও সংযোগ তৈরি হয়, তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিতে পারে না।
তবে সঠিক নিয়ন্ত্রণ ও সচেতন ব্যবহারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের আরও ভালো শ্রোতা হতে অনুপ্রাণিত করতে পারে। শেষ পর্যন্ত, মানুষের মধ্যে গভীরভাবে শোনা ও শোনানোই এমন এক অভিজ্ঞতা, যা এখনো যন্ত্রের পক্ষে পুরোপুরি অনুকরণ করা সম্ভব নয়।
















