বাংলাদেশে রাষ্ট্রক্ষমতার দীর্ঘদিনের এককেন্দ্রিকতা ভেঙে একটি ভারসাম্যপূর্ণ শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতির হাতে কার্যকর ক্ষমতা দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ। বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) চট্টগ্রামে আয়োজিত এক বিভাগীয় মতবিনিময় সভায় তিনি জানান, নির্বাচন কমিশন গঠনসহ গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা শক্তিশালী করতে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছেছে।
প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা ও সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা
অধ্যাপক আলী রীয়াজ তার বক্তব্যে গত ১৬ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, বিদ্যমান সংবিধানে একজন ব্যক্তির হাতে অভাবনীয়ভাবে ক্ষমতা পুঞ্জীভূত হয়েছে। তিনি বলেন, “সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠনের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির হলেও বাস্তবে তা প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে সম্পন্ন হয়। এই ব্যবস্থার পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, প্রধানমন্ত্রী যখন একইসঙ্গে নির্বাহী প্রধান, সংসদ নেতা এবং দলীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তখন শাসনব্যবস্থা ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়। এই ঝুঁকি এড়াতেই ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এ সংস্কার প্রস্তাবগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের তাৎপর্য
আসন্ন ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দিন একইসঙ্গে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল আলোচিত গণভোট। এই গণভোটের মূল লক্ষ্য হলো ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ বাস্তবায়ন।
- ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রভাব: আলী রীয়াজ স্পষ্ট করেছেন যে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার অর্থ হলো দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলে নতুন সংস্কার মেনে নেওয়া। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো আটকে দেওয়া সম্ভব হবে না।
- আইনি বাধা নেই: গণভোটের প্রচারণায় কোনো আইনি বা সাংবিধানিক বাধা নেই বলে নিশ্চিত করেছেন তিনি। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মত অনুযায়ী, এই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালানো সম্পূর্ণ বৈধ।
সংস্কারের মূল ক্ষেত্রসমূহ
বিভাগীয় মতবিনিময় সভা ও ইমাম সম্মেলনে তিনি সংস্কারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন:
১. রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা: নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির কার্যকর ভূমিকা।
২. আইনসভার উচ্চকক্ষ: ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে সংসদে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব।
৩. প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদে সীমাবদ্ধতা: একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর বা দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।
৪. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: বিচার বিভাগ ও অন্যান্য সরকারি কমিশনগুলোকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত করা।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, “এই গণভোট কেবল একটি নির্বাচন নয়, বরং এটি আগামী প্রজন্মের জন্য ইনসাফভিত্তিক একটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র কাঠামো তৈরির লড়াই।” সম্মেলনে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন এবং তারা আসন্ন গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতির কথা জানান।















