দেড় দশকে গুম হওয়াদের মধ্যে জামায়াত-শিবির বেশি হলেও নিখোঁজদের ৬৮ শতাংশ বিএনপি-যুবদলের; বরেণ্য রাজনৈতিক নেতাদের গুমের নির্দেশে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ।
গুম বিষয়ক তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং আসাদুজ্জামান খানের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে। প্রতিবেদনে ১,৫৬৯টি গুমের ঘটনা ও গোপন বন্দিশালার তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলো ছিল রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। গুম বিষয়ক তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ‘হাই প্রোফাইল’ গুমের ঘটনাগুলোতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সরাসরি জড়িত ছিলেন।
মঙ্গলবার প্রকাশিত ‘আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ’ শীর্ষক ২১৮ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে গুমের শিকার ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং তাদের নিখোঁজ হওয়ার নেপথ্যের কারণগুলো সবিস্তারে তুলে ধরা হয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয়ে গুম ও নিখোঁজের পরিসংখ্যান কমিশন ১,৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে ১,৫৬৯টি একক গুমের ঘটনা আমলে নিয়েছে। এর মধ্যে ৯৪৮ জনের রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়:
- গুমের শিকার: জামায়াত-শিবিরের ৭১২ জন এবং বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের ২০৫ জন।
- নিখোঁজ (যারা ফেরেননি): নিখোঁজদের মধ্যে ৬৮ শতাংশই বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মী। জামায়াত-শিবিরের ক্ষেত্রে এই হার ২২ শতাংশ।
গোপন বন্দিশালা ও ‘ফরেন গেস্ট’ তদন্তে র্যাব ও অন্যান্য বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা মোট ৪০টি গোপন বন্দিশালা বা ‘ডিটেনশন সেন্টার’-এর সন্ধান পেয়েছে কমিশন। এর মধ্যে র্যাবেরই রয়েছে ২২-২৩টি। ভুক্তভোগীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, জিজ্ঞাসাবাদের সময় ইংরেজিভাষী বিদেশিরাও উপস্থিত থাকতেন, যাদেরকে ‘ফরেন গেস্ট’ হিসেবে সম্বোধন করা হতো।
কমিশনের প্রধান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী জানান, অনেককে হত্যার পর লাশ গুম করা হয়েছে। তদন্ত অনুযায়ী, বরিশালের বলেশ্বর নদীতে সবচেয়ে বেশি লাশ ফেলা হয়েছে। এছাড়া বুড়িগঙ্গা ও মুন্সিগঞ্জেও লাশ গুমের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম এবং জামায়াত নেতা আমান আযমীর মতো ব্যক্তিদের গুমের ক্ষেত্রে ‘সর্বোচ্চ পর্যায়ের’ নির্দেশ ছিল বলে প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৩ ও ২০১৬ সালে গুমের সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ। ২০১৬ সালের পর গুমের পদ্ধতি কিছুটা পরিবর্তন হয়। কমিশন বলছে, জিয়াউল আহসানের মতো কর্মকর্তাদের বদলি এবং আন্তর্জাতিক চাপের কারণে সরাসরি নিখোঁজ করার চেয়ে ‘হেফাজতে দেখানো’ বা ‘বিচারিক প্রক্রিয়ায়’ পাঠানোর প্রবণতা বাড়ে। বিশেষ করে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের ‘সন্ত্রাসবাদের’ ট্যাগ দিয়ে জীবিত হাজির করা হতো আন্তর্জাতিক বৈধতা পাওয়ার জন্য।
কমিশনের সুপারিশ : রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর অপব্যবহার বন্ধে কমিশন বেশ কিছু কঠোর সুপারিশ করেছে:
- র্যাব, এনএসআই ও ডিজিএফআই থেকে সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার।
- প্রতিটি গোয়েন্দা সংস্থার আমূল সংস্কার এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাদের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা।
- নিখোঁজ ব্যক্তিদের শনাক্তে ডিএনএ প্রোফাইলিং ও আন্তর্জাতিক মানের তদন্ত নিশ্চিত করা।
গুম কমিশন স্পষ্ট করেছে যে, বিগত সরকার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে, যার ফলে আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে নাগরিকদের জীবন ও স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে।
















