১৩ অক্টোবর ২০২৫ । প্রযুক্তি প্রতিবেদন
এক যুগ আগে প্রযুক্তি দুনিয়াকে বদলে দিয়েছিল উইন্ডোজ ১০। কিন্তু ১৪ অক্টোবর ২০২৫—তারিখটি ইতিহাসে লিখে থাকবে এক যুগের অবসান হিসেবে। এই দিন থেকেই মাইক্রোসফট উইন্ডোজ ১০-এর সব ধরনের সাপোর্ট বন্ধ করে দিচ্ছে।
এর মাধ্যমে শেষ হতে যাচ্ছে এমন এক সফটওয়্যারের অধ্যায়, যা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে ডিজিটাল কর্মজীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে এনেছিল।
মাইক্রোসফটের ঘোষণায় বলা হয়েছে, ১৪ অক্টোবরের পর আর কোনো সিকিউরিটি আপডেট, বাগ ফিক্স বা টেকনিক্যাল সাপোর্ট দেওয়া হবে না। অর্থাৎ, উইন্ডোজ ১০ চালানো ডিভাইসগুলো ধীরে ধীরে নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়বে।
বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৪০ কোটি সক্রিয় উইন্ডোজ ব্যবহারকারীর মধ্যে ৪৩ শতাংশই এখনও উইন্ডোজ ১০-এ আছেন। এদের অনেকের হার্ডওয়্যার উইন্ডোজ ১১ চালাতে সক্ষম নয়, যা ব্যবহারকারীদের সামনে এক কঠিন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
প্রযুক্তি থেকে অর্থনীতি:
এক বহুমাত্রিক প্রভাব প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি শুধুই একটি সফটওয়্যার পরিবর্তন নয়— বরং গ্লোবাল টেক ইকোনমি, ভোক্তা অধিকার এবং পরিবেশনীতির এক জটিল সংঘর্ষ।
ভোক্তাদের চাপ:
- লক্ষাধিক পুরোনো কম্পিউটার অকেজো হয়ে যাবে।
- নতুন উইন্ডোজ ১১ বা আসন্ন ১২ চালাতে সক্ষম হতে নতুন হার্ডওয়্যার প্রয়োজন হবে।
- উন্নয়নশীল দেশে (যেমন বাংলাদেশ, ভারত, ফিলিপাইন) অনেক ব্যবহারকারীর পক্ষে সেই খরচ বহন করা সম্ভব নয়।
অর্থনৈতিক পরিণতি:
Gartner-এর হিসাব অনুযায়ী, উইন্ডোজ ১০ সাপোর্ট বন্ধ হলে ২০২৫-২৬ সালে নতুন কম্পিউটার বিক্রি ১৮% বাড়বে। কিন্তু এর সঙ্গে বাড়বে ই-ওয়েস্ট উৎপাদন, যা বৈশ্বিক পরিবেশগত ভারসাম্যে নতুন হুমকি তৈরি করবে।
পরিবেশ ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট
ভোক্তা অধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বলছে, মাইক্রোসফটের সিদ্ধান্তটি “পরিকল্পিত পুরোনোত্ব” (planned obsolescence) কৌশলের অংশ যেখানে কোম্পানিগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে পুরোনো ডিভাইসকে অকেজো করে নতুন বিক্রির সুযোগ তৈরি করে।
নাথান প্রক্টর, মার্কিন ভোক্তা অধিকার সংগঠন PIRG-এর পরিচালক, বলেছেন:
“এই সিদ্ধান্ত শুধু ব্যবহারকারীদের নয়, পৃথিবীর জন্যও বিপর্যয় ডেকে আনবে। কোটি কোটি ডিভাইস ফেলে দেওয়া হবে, যা ই-ওয়েস্ট হিসেবে গ্লোবাল সাউথে চলে যাবে।”
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবেশ কমিশনার ভেরোনিকা কেলার ব্রাসেলসে বলেছেন,
“এই ধরনের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক ই-ওয়েস্ট চুক্তির চেতনার পরিপন্থী। আমরা মাইক্রোসফটের সঙ্গে আলোচনায় বসব—বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সফটওয়্যার সাপোর্ট বাড়ানোর বিষয়ে।”
নিরাপত্তা ঝুঁকি
সাইবার বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—
উইন্ডোজ ১০ সাপোর্ট বন্ধ মানে, বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি ডিভাইস “হ্যাকারদের মুক্ত ক্ষেত্র” হয়ে যাওয়া।
লন্ডনভিত্তিক সাইবার রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. রিচার্ড হিউজ বলেন,
“২০২৬ সালের মধ্যে উইন্ডোজ ১০ চালিত প্রতিটি ডিভাইসই র্যানসমওয়্যার আক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকবে।
এটি বৈশ্বিক সাইবার নিরাপত্তা অবকাঠামোর জন্য নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।”
মাইক্রোসফট অবশ্য বলছে, তাদের নতুন প্রজন্মের অপারেটিং সিস্টেম (উইন্ডোজ ১১ ও পরবর্তী সংস্করণ) “হার্ডওয়্যার-ভিত্তিক নিরাপত্তা স্থাপত্যে” নির্মিত, যা পুরোনো কম্পিউটার সমর্থন করতে পারে না।
মাইক্রোসফটের প্রতিক্রিয়া ও প্রতিরক্ষা
মাইক্রোসফটের কর্পোরেট ভাইস প্রেসিডেন্ট ইউসুফ মেহেদি এক বিবৃতিতে বলেছেন:
“উইন্ডোজ ১০ সাপোর্ট শেষ করা কোনো বাজার কৌশল নয়, এটি নিরাপত্তা এবং স্থায়িত্বের বিবর্তন। প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, পুরোনো সিস্টেমগুলোর সীমাবদ্ধতা তত প্রকট হচ্ছে।”
তবে সমালোচকরা বলছেন,
মাইক্রোসফটের এই ব্যাখ্যা “আংশিক সত্য”। কারণ, উইন্ডোজ ১১ চালানোর জন্য TPM 2.0 চিপ ও নির্দিষ্ট প্রসেসর প্রয়োজন, যা পুরোনো মেশিনে নেই।
ফলে অনেক ব্যবহারকারী বাধ্য হচ্ছেন নতুন হার্ডওয়্যার কিনতে—যা কোম্পানির পরোক্ষভাবে আয় বাড়াচ্ছে।
ইউজারদের বিকল্প পথ
বর্তমানে মাইক্রোসফট তিনটি বিকল্প দিয়েছে:
- উইন্ডোজ ১১-এ আপগ্রেড (বিনামূল্যে) – যদি হার্ডওয়্যার সমর্থন করে।
- বর্ধিত নিরাপত্তা আপডেট (ESU) – বছরে ৩০ ডলার (ব্যক্তিগত) বা ৬১ ডলার (বাণিজ্যিক) ফি দিয়ে নিরাপত্তা আপডেট পাওয়া যাবে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত।
- বিকল্প অপারেটিং সিস্টেম – বিশেষ করে লিনাক্স ও ক্রোমওএস জনপ্রিয় হয়ে উঠছে পুরোনো ডিভাইস সংরক্ষণে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে ইএসইউ ফি মওকুফ করা হয়েছে, তবে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে এটি কার্যকর থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
- প্রফেসর ড. স্যান্ড্রা লিউ (সিঙ্গাপুর টেক ইউনিভার্সিটি):
“এটি পশ্চিমা প্রযুক্তি নির্ভরতার একটি উদাহরণ। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নিজেদের ওপেন-সোর্স সফটওয়্যার উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।”- ড. মোহাম্মদ জুবায়ের (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইনফরমেশন টেকনোলজি):
“বাংলাদেশের সরকারি দপ্তর ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ এখনও উইন্ডোজ ১০ ব্যবহার করে। সাপোর্ট বন্ধ হলে সাইবার ঝুঁকি বাড়বে।”- সাইবার নিরাপত্তা গবেষক অ্যালেক্স ওয়ালেস:
“এই পরিবর্তন বৈশ্বিক সাইবার যুদ্ধক্ষেত্রে ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। পুরোনো সিস্টেমের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের হ্যাকিং বৃদ্ধি পাবে।”
বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া
- ইউরোপীয় ইউনিয়ন টেকসই সফটওয়্যার আইন পাসের প্রস্তাব করেছে, যাতে সফটওয়্যার সাপোর্ট অন্তত ১৫ বছর বাধ্যতামূলক করা হয়।
- ভারত ও ইন্দোনেশিয়া উইন্ডোজ বিকল্প হিসেবে নিজস্ব লিনাক্স-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির প্রকল্প ঘোষণা করেছে।
- বাংলাদেশ ও ফিলিপাইন তাদের সরকারি দপ্তরগুলোতে “ওপেন-সোর্স ট্রানজিশন পাইলট” চালু করতে যাচ্ছে।
এক যুগের শেষ, এক নতুন বাস্তবতার শুরু
উইন্ডোজ ১০ শুধু একটি সফটওয়্যার নয়, ছিল এক প্রজন্মের ডিজিটাল আত্মপরিচয়ের অংশ।
কিন্তু এখন তা ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে—যেখানে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, কর্পোরেট স্বার্থ, ভোক্তা অধিকার ও পরিবেশনীতি এক অদ্ভুত জটিল ভারসাম্যে দাঁড়িয়ে আছে।
এই সিদ্ধান্ত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়:
প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, টেকসই নীতি ছাড়া তা টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে না।
















