৯ জানুয়ারি ২০২৬: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক সংস্কার এবং ইউরোপজুড়ে ডানপন্থার উত্থানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার মাধ্যমে স্পেনকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণে পরিণত করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। তবে দুর্নীতি কেলেঙ্কারি, যৌন হয়রানির অভিযোগ এবং শক্তিশালী হয়ে ওঠা কট্টর ডানপন্থা তার রাজনৈতিক প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
গত মাসে স্পেনের এক্সট্রেমাদুরা অঞ্চলের নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থীদের সাফল্যকে অনেকেই অনিবার্য বলে মনে করছেন। গত গ্রীষ্ম থেকে সানচেজের সমাজতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতি ও হয়রানির অভিযোগ ওঠার পর রাজনৈতিক পরিবেশ ক্রমেই প্রতিকূল হয়ে উঠেছে। যদিও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলটি ঐতিহাসিকভাবে তার দলের শক্ত ঘাঁটি ছিল, ২০২৩ সাল থেকে অঞ্চলটি রক্ষণশীল পিপলস পার্টি ও কট্টর ডানপন্থী ভক্সের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এই জোট ইতোমধ্যে ভ্যালেন্সিয়া ও মুরসিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল শাসন করেছে এবং বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৭ সালের জাতীয় নির্বাচনে তারাই ক্ষমতায় আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইউরোপে কার্যত কোনো সমাজতান্ত্রিক সরকার অবশিষ্ট থাকবে না। ডেনমার্কে প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেনের নেতৃত্বাধীন সরকারকে সমাজতান্ত্রিক বলা হলেও, অভিবাসনবিরোধী কঠোর অবস্থানের কারণে সেটিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, ইউরোপের নতুন অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে পরিণত করা, সবুজ জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং গাজায় ইসরায়েলি অভিযানের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার পরও কেন পরাজয়ের পথে সানচেজ। তার এই সম্ভাব্য পতন ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ডানপন্থার প্রভাব আরও বাড়াবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
২০২৩ সালের নির্বাচনের পর সানচেজ যে জোট সরকার গঠন করেন, তা শুরু থেকেই ভঙ্গুর ছিল। বামপন্থী জোট সুমার এবং কাতালান স্বাধীনতাকামী দল জুনতস ছিল তার প্রধান মিত্র। নানা ইস্যুতে এই দলগুলো বারবার সমর্থন প্রত্যাহারের হুমকি দেয়। শেষ পর্যন্ত অভিবাসন সংক্রান্ত ক্ষমতা নিয়ে বিরোধের জেরে জুনতস সরকার থেকে সরে দাঁড়ায়।
কাতালোনিয়ায় নতুন কট্টর ডানপন্থী দলের উত্থানের চাপে জুনতস অপরাধে জড়িত অভিবাসীদের বহিষ্কারের ক্ষমতা দাবি করে, যা ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে। সুমার সরকারে থাকলেও সানচেজের দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও হয়রানির অভিযোগে নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করে আসছে।
এই অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে সাবেক গণপূর্ত ও পরিবহনমন্ত্রী হোসে লুইস আবালোসের বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির মামলা। কোভিড মহামারির সময় সরকারি চুক্তি নিয়ে ঘুষ ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তিনি বর্তমানে বিচার-পূর্ব আটক রয়েছেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যৌন অসদাচরণের অভিযোগ নিয়েও দলটির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
এসব ঘটনায় সানচেজ সরকারের সাফল্য অনেকটাই ম্লান হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অথচ তার নেতৃত্বেই ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে পেনশন সংযুক্তকরণ এবং শ্রমবাজার সংস্কারের মাধ্যমে কল্যাণ রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা হয়েছে। এই কারণেই দ্য ইকোনমিস্ট স্পেনকে ধনী দেশগুলোর মধ্যে সেরা অর্থনৈতিক পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি দিয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় বিনিয়োগ টেনে স্পেনকে ইউরোপের অন্যতম পরিচ্ছন্ন জ্বালানি কেন্দ্রেও পরিণত করেছেন সানচেজ। সরকারি তথ্যে দেখা যায়, ২০২২ সালের পর সৃষ্ট নতুন চাকরির প্রায় ৪৫ শতাংশই বিদেশে জন্ম নেওয়া কর্মীদের মাধ্যমে পূরণ হয়েছে, যা শ্রমবাজার সম্প্রসারণে তাদের ভূমিকা তুলে ধরে।
ইউরোপের অধিকাংশ মধ্য-বাম নেতার বিপরীতে সানচেজ সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির বিরোধিতা করে ঐতিহ্যবাহী সমাজতান্ত্রিক অবস্থান ধরে রেখেছেন। এতে যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে তার টানাপোড়েন বেড়েছে। ন্যাটো সম্মেলনে প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৩.৫ শতাংশে উন্নীত করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যেই স্পেনকে হুমকি দেন।
ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কঠোর নিয়ন্ত্রণের দাবিও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সানচেজের আরেকটি বিরোধের কারণ। ইউরোপের অন্য কোনো সমাজতান্ত্রিক দল এ অবস্থানে তার পাশে দাঁড়ায়নি, বরং অনেক ডানপন্থী সরকার ওয়াশিংটনের নীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের মধ্য-বাম রাজনীতির এই সংকট সমাজতন্ত্রের মূল ধারণাকেই দুর্বল করে দিয়েছে। গত দুই দশকে অধিকাংশ সমাজতান্ত্রিক দল উদারনৈতিক ধারার দিকে ঝুঁকেছে, ফলে তারা ডানপন্থী বা উদারপন্থীদের থেকে আলাদা হয়ে উঠতে পারছে না।
যদিও বামপন্থী ভোটারদের মধ্যে সানচেজ এখনও জনপ্রিয়, তবে আসন্ন আঞ্চলিক নির্বাচনে তার জয় সহজ হবে না। অনেকের মতে, স্পেনের এই সমাজতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা ইউরোপের বাম রাজনীতির সংকট মোকাবিলার শেষ বড় প্রচেষ্টা হিসেবেই ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।















