যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছেন, তিনি গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে আনতে চান। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি আরও কড়া ভাষায় ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, প্রয়োজন হলে সামরিক শক্তিসহ যেকোনো পথ বেছে নিতে পারেন। গ্রিনল্যান্ডের আইনপ্রণেতা ও ডেনমার্কের বিরোধিতার পরও ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র সেখানে কিছু একটা করবেই, গ্রিনল্যান্ডবাসী তা চাইুক বা না চাইুক।
হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ড দখলে না নেয়, তাহলে রাশিয়া বা চীন সেখানে প্রভাব বিস্তার করবে, যা তিনি কোনোভাবেই মেনে নেবেন না। তিনি বলেন, সহজ পথে সমঝোতা করতে তিনি আগ্রহী, তবে তা সম্ভব না হলে কঠোর পথও বিবেচনায় থাকবে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে অপহরণের ঘটনার পর ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষ্য গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতেও আরও আগ্রাসী হয়ে উঠেছে।
গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, যার জনসংখ্যা প্রায় ছাপ্পান্ন হাজার। দ্বীপটির প্রায় আশি শতাংশ বরফে ঢাকা এবং রাজধানী নুকেই বসবাস করে জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ। ২০০৯ সাল থেকে গ্রিনল্যান্ডের জনগণের ভোটে স্বাধীন হওয়ার অধিকার রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা গ্রিনল্যান্ডবাসীদের আর্থিক প্রলোভন দেওয়ার বিষয়টি আলোচনা করেছেন বলে জানা গেছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিজন গ্রিনল্যান্ডবাসীকে দশ হাজার থেকে এক লাখ ডলার পর্যন্ত দেওয়ার প্রস্তাব ভাবছে, যাতে তারা ডেনমার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পক্ষে ভোট দেয়। সর্বোচ্চ অঙ্ক ধরা হলে এর ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় পাঁচ দশমিক ছয় বিলিয়ন ডলার।
গ্রিনল্যান্ড নিজস্ব সরকার ও অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করলেও পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক বিষয় এখনো ডেনমার্কের হাতে। ট্রাম্প এর আগেও গ্রিনল্যান্ড দখলের আকাঙ্ক্ষাকে একটি বড় রিয়েল এস্টেট চুক্তির সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তবে জরিপ বলছে, গ্রিনল্যান্ডবাসীর প্রায় পঁচাশি শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে রাজি নয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যেও সামরিক আগ্রাসনের পক্ষে সমর্থন খুবই কম।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র জানিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার বিষয়টি প্রশাসনের আলোচনায় রয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীও কংগ্রেস সদস্যদের বলেছেন, সামরিক হামলার চেয়ে কেনার পথই ট্রাম্প বেশি পছন্দ করেন। তবে নুক ও কোপেনহেগেন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির প্রশ্নই ওঠে না। ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্র লুইজিয়ানা ও আলাস্কা কিনলেও সে সময় সংশ্লিষ্ট দেশগুলো বিক্রিতে সম্মত ছিল, যা বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনীয় নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, গ্রিনল্যান্ডবাসীদের সরাসরি প্রভাবিত করার চেষ্টা ডেনমার্ক ও ইউরোপের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেফ্রি স্যাক্স বলেছেন, গ্রিনল্যান্ডের প্রকৃত কৌশলগত ও অর্থনৈতিক মূল্য যুক্তরাষ্ট্র যে অর্থ দিতে চাইছে, তার চেয়ে অনেক বেশি। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নকে এই ধরনের উদ্যোগের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান।
সামরিক হামলার সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া হয়নি। ডেনমার্ক ন্যাটোর সদস্য এবং কোনো হামলা হলে সামরিক জোট ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের আগে থেকেই শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। ১৯৫১ সালের এক চুক্তির আওতায় থুলে ঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা ও মহাকাশ নজরদারির কাজ চালায়। সেখানে প্রায় ছয় শতাধিক মার্কিন ও মিত্র দেশের সদস্য মোতায়েন রয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, চাইলে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের প্রতিরোধ ছাড়াই দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে।
এ ছাড়া হোয়াইট হাউসে আরেকটি বিকল্প নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিশেষ ধরনের চুক্তি, যেখানে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্র নেবে এবং অর্থনৈতিক সহায়তা দেবে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় কয়েকটি দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এমন চুক্তির উদাহরণ রয়েছে। তবে এর জন্য গ্রিনল্যান্ডকে আগে ডেনমার্ক থেকে আলাদা হতে হবে।
ট্রাম্পের আগ্রহের মূল কারণ হিসেবে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে। উত্তর আমেরিকা থেকে ইউরোপে যাওয়ার সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ গ্রিনল্যান্ডের ওপর দিয়ে। এ ছাড়া দ্বীপটি বিরল খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। ইউরোপীয় কমিশনের এক জরিপ অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বড় অংশ গ্রিনল্যান্ডে পাওয়া যায়। যদিও এখনো সেখানে তেল গ্যাস উত্তোলন হয় না এবং স্থানীয় আদিবাসীরা খনির বিরোধিতা করে আসছে। বর্তমানে দ্বীপটির অর্থনীতি মূলত মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল।
















