ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দেশটির জাতীয় স্বার্থ, কৌশলগত স্থাপনা ও জনসম্পদ রক্ষায় তারা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারের সমর্থনে দেশজুড়ে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ আরও তীব্র হওয়ায় এ ঘোষণা আসে। শনিবার আধা সরকারি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সেনাবাহিনী জনগণকে শত্রুপক্ষের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করার আহ্বান জানায়।
বিবৃতিতে ইসরাইল ও শত্রুভাবাপন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দুর্বল করার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে বলা হয়, সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশনায় সেনাবাহিনী ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী যৌথভাবে আঞ্চলিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং জাতীয় স্বার্থ, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও সরকারি সম্পদ রক্ষায় কঠোর অবস্থানে থাকবে।
ইরানের প্রভাবশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীও আলাদা বিবৃতিতে জানায়, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের অর্জন ও দেশের নিরাপত্তা রক্ষা তাদের জন্য লাল রেখা। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে বলা হয়, তারা যেকোনো হুমকি কঠোরভাবে মোকাবিলা করবে।
এরই মধ্যে ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি আজাদ সতর্ক করে বলেছেন, যারা বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছে তাদের ঈশ্বরের শত্রু হিসেবে গণ্য করা হবে, যা মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত অন্তত একশ সশস্ত্র বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানের জনগণের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা চালানোর পর এ মন্তব্য করেন তিনি। এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের নেতৃত্বকে সতর্ক করে বলেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্রও জবাব দিতে প্রস্তুত থাকবে। তিনি দাবি করেন, পরিস্থিতি এমন দিকে যাচ্ছে যেখানে মানুষ এমন সব শহরের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে, যা আগে কল্পনাও করা হয়নি।
গত ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে দেশজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়। ধীরে ধীরে তা ইসলামী শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নেয়। শনিবার রাতেও অস্থিরতা অব্যাহত ছিল। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, তেহরানের পশ্চিমের কারাজ শহরে বিক্ষোভকারীরা একটি পৌর ভবনে আগুন দিয়েছে। অন্যদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর নিহত সদস্যদের জানাজা ও দাফনের দৃশ্য সম্প্রচার করা হয় শিরাজ, কুম ও হামেদান শহর থেকে। বিদেশভিত্তিক ফার্সি ভাষার টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে মাশহাদ ও তাবরিজে নতুন করে বড় বিক্ষোভের চিত্রও দেখা গেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বিক্ষোভকারীদের নাশক ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে অভিহিত করেছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ট্রাম্পের হাতে বহু ইরানির রক্ত লেগে আছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নেতৃত্বও একদিন পতনের মুখে পড়বে। তিনি বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং নাশকতাকারীদের কাছে কখনো মাথা নত করবে না।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি লেবানন সফরে গিয়ে অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে সহিংসতায় রূপ দিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এ অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক জানান, রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে এবং অনেক জায়গায় তা সহিংস রূপ নিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার একদিকে নিরাপত্তা জোরদার করছে, অন্যদিকে নতুন ভর্তুকি কর্মসূচি চালুর ঘোষণা দিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার চাপের মধ্যে এসব পদক্ষেপ মানুষের ক্ষোভ কমাতে পারবে না।
২০২২ থেকে ২০২৩ সালের মাহসা আমিনি মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হওয়া আন্দোলনের পর এটিই ইরানে সবচেয়ে বড় গণবিক্ষোভ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এদিকে কর্তৃপক্ষের আরোপ করা দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধের অবস্থা ৩৬ ঘণ্টা পেরিয়েছে বলে জানিয়েছে নেটব্লকস। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, এই ইন্টারনেট বন্ধের উদ্দেশ্য হলো বিক্ষোভ দমনের সময় সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য আড়াল করা।
এদিকে ইরানের সাবেক শাহর ছেলে রেজা পাহলভি জনগণকে আরও সংগঠিত ও লক্ষ্যভিত্তিক আন্দোলনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি শহরের কেন্দ্রগুলো দখল ও ধরে রাখার কথা বলেন এবং শিগগিরই দেশে ফেরার ইঙ্গিত দেন। নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে এ পর্যন্ত অন্তত ৫১ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে নয়জন শিশু।
অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে ইরানে অতিরিক্ত ও প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে তা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, ইতোমধ্যে বহু প্রাণ ঝরে গেছে, যা গভীর উদ্বেগের বিষয়।
















