ইউক্রেন যুদ্ধের ১৪০৩তম দিনে কিয়েভের আকাশ আবারও আগুনে রঙিন হয়ে উঠল। ভোরের আলো ফোটার আগেই রাশিয়ার শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ে ইউক্রেনের রাজধানী ও আশপাশের এলাকায়। এই হামলায় অন্তত দুইজন প্রাণ হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন আরও ৪৬ জন, যাদের মধ্যে রয়েছে দুই শিশু। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া স্বপ্ন আর কান্নার শব্দে ভারী হয়ে উঠেছে শহর।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, প্রায় ৫০০ ড্রোন ও ৪০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে, যার লক্ষ্য ছিল জ্বালানি অবকাঠামো ও বেসামরিক স্থাপনা। আঘাত লেগেছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে। রাষ্ট্রায়ত্ত গ্রিড পরিচালনাকারী সংস্থা জানায়, কিয়েভজুড়ে জরুরি বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করতে হয়েছে। বেসরকারি জ্বালানি কোম্পানি ডিটিইকে জানিয়েছে, রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় এক মিলিয়নের বেশি পরিবার বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে।
শীতের তাপমাত্রা যখন শূন্য ডিগ্রির কাছাকাছি, তখন কিয়েভের ৪০ শতাংশের বেশি আবাসিক ভবন তাপ সরবরাহ হারিয়েছে বলে জানান ইউক্রেনের উপপ্রধানমন্ত্রী ওলেক্সি কুলেবা। অন্ধকার আর ঠান্ডার মধ্যে মানুষ জড়ো হচ্ছে আশ্রয়কেন্দ্রে, চোখে আতঙ্ক আর অপেক্ষা।
হামলার ঢেউ ইউরোপের সীমান্তও কাঁপিয়ে দেয়। পোল্যান্ডের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের দুটি বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। আকাশে ওঠে পোলিশ ও মিত্রবাহিনীর যুদ্ধবিমান, যদিও দেশটির আকাশসীমা লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
অন্যদিকে রাশিয়ায় মস্কোর দিকে আসা ১১টি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছেন শহরের মেয়র। নিরাপত্তার কারণে রাজধানীর দুটি বড় বিমানবন্দরে সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে ছয়টি অঞ্চলে শতাধিক ইউক্রেনীয় ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে।
মাঠের যুদ্ধে রাশিয়া দাবি করেছে, তারা ডোনেৎস্ক ও জাপোরিঝিয়া অঞ্চলের কয়েকটি শহর দখল করেছে। তবে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী বলছে, ওই এলাকাগুলোতে রুশ অগ্রযাত্রা তারা প্রতিহত করেছে।
এই রক্তক্ষয়ী ঘটনার মধ্যেই কূটনীতির মঞ্চে ব্যস্ততা। জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে জানান, যুদ্ধ বন্ধে আঞ্চলিক প্রশ্ন ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে আলোচনা হবে। বৈঠকের আগে তিনি কানাডার হ্যালিফ্যাক্সে থেমে দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
কার্নি রাশিয়ার হামলাকে বর্বরতা আখ্যা দিয়ে ইউক্রেনের পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি ইউক্রেনের জন্য অতিরিক্ত অর্থনৈতিক সহায়তার ঘোষণাও দেন। ইউরোপীয় নেতারাও জেলেনস্কির প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী শান্তির জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করবেন।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেন, কিয়েভে হামলা প্রমাণ করে মস্কো শান্তি চায় না। বিপরীতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, কিয়েভ যদি শান্তিপূর্ণ সমাধানে আগ্রহী না হয়, তবে রাশিয়া শক্তি প্রয়োগ করেই তার লক্ষ্য পূরণ করবে।
১৪০৩ দিনের এই যুদ্ধে আবারও স্পষ্ট হলো, গোলার শব্দের সঙ্গে কূটনৈতিক কথাবার্তা পাশাপাশি চললেও, শান্তির পথ এখনো রক্ত আর ধ্বংসের ছায়ায় ঢাকা।
















