বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান টানাপোড়েন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক
বাংলাদেশ–ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কে সাম্প্রতিক উত্তেজনা দুই দেশের সম্পর্ককে এক সংকটময় মোড়ে নিয়ে এসেছে। পারস্পরিক সম্মান, সংযম ও দায়িত্বশীল আচরণ ছাড়া এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে বাংলাদেশ ও ভারত-এর কূটনৈতিক সম্পর্ক এক উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই দিনে দুই দেশের রাজধানীতে একে অপরের হাইকমিশনারকে তলব করার ঘটনা নজিরবিহীন। মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে পাল্টাপাল্টি একাধিকবার কূটনীতিক তলব পরিস্থিতির গভীরতা আরও স্পষ্ট করে।
এই টানাপোড়েনের পটভূমি নতুন নয়। বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থান ও দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের অবসানকে ভারত সরকার যে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারেনি, সেটি এখন বাংলাদেশের জনগণের কাছে স্পষ্ট। দীর্ঘ সময় ধরে ভারতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থনেই একটি অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকে ছিল—এমন বিশ্বাস সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেড় বছরে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও ইতিবাচক সাড়া সীমিত ছিল। উল্টো ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন মহল থেকে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা জোরালো হয়েছে। বাণিজ্যিক বাধা, ভিসা প্রক্রিয়া সংকোচন এবং কূটনৈতিক শীতলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো—ভারতের ভূখণ্ডে আশ্রয় নেওয়া ক্ষমতাচ্যুত শাসক ও তাঁর সহযোগীদের উসকানিমূলক বক্তব্য ও তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের অভাব। এর ফলে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে এই ধারণা জোরালো হচ্ছে যে, ভারতের মাটি বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর তৎপরতা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। দিল্লি, কলকাতা ও মুম্বাইয়ে বাংলাদেশ মিশন লক্ষ্য করে বিক্ষোভ, শিলিগুড়িতে ভিসা সেন্টারে হামলা এবং কূটনৈতিক এলাকায় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থি। এসব কারণে একাধিক শহরে ভিসা কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশ।
এই ধারাবাহিক ঘটনায় বাংলাদেশের জনগণের—বিশেষ করে তরুণদের—মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে, যার প্রতিফলন পড়ছে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও। সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড ও সহিংস ঘটনাকে ঘিরে সীমান্ত–সংবেদনশীলতা আরও তীব্র হয়েছে, যা দুই দেশের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের স্থিতিশীলতা শুধু কূটনৈতিক সৌজন্যের বিষয় নয়; এটি দুই দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক শান্তির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই ভারতের নীতিনির্ধারকদের বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করতে হবে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের পুরোনো মানসিকতা থেকে সরে আসাই সময়ের দাবি।
সংযম, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীল আচরণই পারে এই কূটনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত করতে। পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতেই দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক এগোতে পারে—এটাই প্রত্যাশা।















