ফ্রান্সের সঙ্গে টানাপোড়েনের মধ্যেই আলজেরিয়ার সংসদে একটি খসড়া আইন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে, যার মাধ্যমে দেশটিতে ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আলজেরিয়ার পিপলস ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির তথ্য অনুযায়ী, বুধবার এই খসড়া আইনের ওপর ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
উত্তর আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়ায় ফ্রান্সের শাসনকাল ছিল ১৩০ বছরেরও বেশি সময়জুড়ে। এই সময়ে নির্যাতন, জোরপূর্বক গুম, গণহত্যা, অর্থনৈতিক শোষণ এবং মুসলিম আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ব্যাপক প্রান্তিককরণের অভিযোগ রয়েছে। ১৯৬২ সালে আলজেরিয়া স্বাধীনতা অর্জন করলেও এর মূল্য দিতে হয়েছে বিপুল মানবিক ক্ষতির মাধ্যমে। ধারণা করা হয়, স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ নিহত হন, হাজারো মানুষ নিখোঁজ হন এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।
সংসদের নিম্নকক্ষ পিপলস ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে শনিবার উত্থাপিত এই খসড়া আইনে ১৮৩০ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সের শাসনকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার কথা বলা হয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি অধ্যায় ও ২৭টি ধারায় বিভক্ত এই প্রস্তাব আন্তর্জাতিক আইনের নীতির আলোকে জনগণের আইনি প্রতিকার পাওয়ার অধিকার এবং ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে সামনে রেখে তৈরি করা হয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, এই আইনের উদ্দেশ্য হলো ঔপনিবেশিক শাসনের দায় নির্ধারণ, আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও ক্ষমা আদায় করা, যাতে ইতিহাসের সঙ্গে পুনর্মিলন সম্ভব হয় এবং জাতীয় স্মৃতি সংরক্ষিত থাকে।
খসড়া আইন উপস্থাপনকালে সংসদের স্পিকার ইব্রাহিম বুগালি বলেন, এটি শুধু একটি আইনি নথি নয়, বরং আধুনিক আলজেরিয়ার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তার ভাষায়, এটি সার্বভৌমত্বের চূড়ান্ত প্রকাশ, নৈতিক অবস্থান এবং একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা, যা আলজেরিয়ার জনগণের আত্মত্যাগের প্রতি রাষ্ট্রের আনুগত্য তুলে ধরে।
তিনি আরও বলেন, ফরাসি শাসন শুধু সম্পদ লুটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এর সঙ্গে পরিকল্পিত দারিদ্র্য, অনাহার ও বঞ্চনার নীতি যুক্ত ছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল আলজেরিয় জনগণের মনোবল ভেঙে দেওয়া, তাদের পরিচয় মুছে ফেলা এবং শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করা।
এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি ফ্রান্স সরকার। তবে অতীতে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ আলজেরিয়ায় ঔপনিবেশিক শাসনের জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। ২০২৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি তার দায়িত্ব নয়, বরং তিনি ইতিহাস ও স্মৃতিকে কেন্দ্র করে আলজেরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পক্ষে।
ফ্রান্স ১৮৩০ সালে আলজেরিয়া দখল করে এবং ১৯৫৪ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজয়ের মাধ্যমে দেশটি ছাড়তে বাধ্য হয়। এই যুদ্ধে ফরাসি বাহিনীর বিরুদ্ধে পরিকল্পিত নির্যাতন, সংক্ষিপ্ত বিচার ছাড়াই হত্যাকাণ্ড ও গুমের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া হাজার হাজার গ্রাম ধ্বংস করা হয় এবং প্রায় ২০ লাখ মানুষকে জোরপূর্বক স্থানচ্যুত করা হয়। ২০১৮ সালে ফ্রান্স সরকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পরিকল্পিত নির্যাতনের দায় স্বীকার করে।
আলজেরিয়া ও ফ্রান্সের মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা চাপে পড়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ফ্রান্স পশ্চিম সাহারা সংকট সমাধানে মরক্কোর স্বায়ত্তশাসন পরিকল্পনাকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে উত্তেজনা বাড়ে। পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে আলজেরিয়া সাহরাউই জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার সমর্থন করে এবং পলিসারিও ফ্রন্টের পক্ষে অবস্থান নেয়।
চলতি বছরের এপ্রিলে প্যারিসে এক আলজেরিয় কূটনীতিকসহ দুই আলজেরিয় নাগরিক গ্রেপ্তারের ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এই ঘটনা ঘটে এমন এক সময়ে, যখন মাত্র এক সপ্তাহ আগে দুই দেশের প্রেসিডেন্ট পারস্পরিক সংলাপ পুনরুজ্জীবনের অঙ্গীকার করেছিলেন।
















