দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা–দালাল চক্রের যোগসাজশে নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়াই পাসপোর্ট ইস্যুর অভিযোগ
দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও দালাল চক্রের সহায়তায় বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া আরও অন্তত ১৮১ রোহিঙ্গার নামে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ইস্যু হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা ও পাসপোর্টের বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
দেশের সাধারণ নাগরিকদের পাসপোর্ট পেতে নানা জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার মুখে পড়তে হলেও, রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে নিয়মের তোয়াক্কা না করেই পাসপোর্ট ইস্যু করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদফতর–এর ভেতরে ও বাইরে সক্রিয় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের ‘বাংলাদেশি নাগরিক’ হিসেবে পাসপোর্ট পাইয়ে দিচ্ছে।
আগেও ১১৮ রোহিঙ্গার পাসপোর্ট, এবার নতুন করে আরও ১৮১ জন
সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, এর আগে অন্তত ১১৮ রোহিঙ্গার নামে পাসপোর্ট ইস্যুর ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হয়। এবার সেই সংখ্যার সঙ্গে যোগ হয়েছে আরও ১৮১ জন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি হতে পারে, তবে পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই।
নিজস্ব তদন্তে পাসপোর্ট অধিদফতর স্বীকার করেছে, রাজধানীর উত্তরা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে ইস্যুকৃত বহু পাসপোর্টে স্থায়ী ঠিকানা ও নাগরিকত্ব সংক্রান্ত তথ্য ছিল ভুয়া। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে আবেদনকারীদের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ভুক্ত বলে উল্লেখ থাকলেও, সেই রিপোর্ট উপেক্ষা করেই পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়।
গুরুতর অপরাধে ‘লঘুদণ্ড’, প্রশ্নবিদ্ধ শাস্তি
এই ঘটনায় দায়ী হিসেবে চিহ্নিত কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে ‘লঘুদণ্ড’ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। উদাহরণ হিসেবে, এক উপ-সহকারী পরিচালককে এক বছরের জন্য বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করা হয়েছে। আরেক কর্মকর্তাকে শুধু তিরস্কার করে অন্য দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।
অথচ অভিযোগ রয়েছে—এসব কর্মকর্তা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) বিপক্ষে রিপোর্ট থাকা সত্ত্বেও তা রিভিউ না করে পাসপোর্ট ইস্যুর প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়েছেন। অনুসন্ধানকারীদের মতে, এটি কেবল প্রশাসনিক অবহেলা নয়, বরং সংঘবদ্ধ দুর্নীতির অংশ।
‘প্যাকেজ ডিল’-এ দুই থেকে তিন লাখ টাকা
সূত্র জানায়, প্রতিটি রোহিঙ্গা পাসপোর্টের জন্য দুই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। আবেদন জমা থেকে পাসপোর্ট হাতে পাওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি চলে তথাকথিত ‘প্যাকেজ ডিল’-এর মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে ভাষা, জন্মসনদ, চেয়ারম্যান সনদ কিংবা স্থায়ী ঠিকানা যাচাই কার্যত করা হয় না।
নিয়ম অনুযায়ী, নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ হলে আবেদনকারীকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করার কথা। কিন্তু অর্থের বিনিময়ে সেই নিয়ম উপেক্ষা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।
সার্ভার পর্যায়েও অনিয়মের অভিযোগ
পাসপোর্ট আবেদন চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য দিয়াবাড়িতে অবস্থিত কেন্দ্রীয় সার্ভারে যাচাই হওয়ার কথা। অভিযোগ রয়েছে, সেখানকার একাধিক কর্মকর্তা এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। ফলে ভুয়া কাগজপত্র থাকলেও অনেক আবেদন ‘ক্লিয়ার’ হয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত ইস্যু হওয়া এসব পাসপোর্টের ফরেনসিক অডিট করা হলে পুরো চক্রের তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
ভাবমর্যাদা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, অবৈধভাবে ইস্যু হওয়া এসব পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে চেষ্টা করা হলেও অনেকেই মন্তব্য করতে রাজি হননি বা যোগাযোগ এড়িয়ে গেছেন।















