জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) পদে আইকিয়ার সাবেক প্রধান নির্বাহী জেসপার ব্রোডিনকে মনোনয়ন দিয়ে সুইডেন বৈশ্বিক শরণার্থী ব্যবস্থায় একটি নতুন ধারা তৈরি করতে চাইছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এই উদ্যোগকে অনেকেই শরণার্থী সুরক্ষার রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বদলে বেসরকারি খাতভিত্তিক মডেলের প্রভাব বাড়ার প্রতীক হিসেবে দেখছেন।
গত ১৪ অক্টোবর সুইডিশ সরকার ঘোষণা দেয়, তারা ইউএনএইচসিআরের শীর্ষ পদে জেসপার ব্রোডিনকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিচ্ছে। এর কিছুদিন পরই বর্তমান হাইকমিশনার ফিলিপো গ্রান্ডির মেয়াদ শেষের পথে থাকায় ব্রোডিন আইকিয়ার প্রধান নির্বাহী পদ থেকে সরে দাঁড়ান। আগামী জানুয়ারি ২০২৬ সালে জাতিসংঘ মহাসচিবের দপ্তর সাধারণ পরিষদের কাছে পছন্দের প্রার্থী উপস্থাপন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আইকিয়ার দীর্ঘদিনের প্রধান হিসেবে ব্রোডিন ব্যবসায়িক নেতৃত্ব, উদ্ভাবন ও টেকসই ব্যবস্থাপনার কথা বলে আসছেন। তবে সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন, করপোরেট দুনিয়ার এই অভিজ্ঞতা কি বাস্তুচ্যুত মানুষের সুরক্ষা ও অধিকার রক্ষার মতো জটিল রাজনৈতিক ও মানবিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর হবে। ইউএনএইচসিআরের মতো সংস্থার নেতৃত্বে এই প্রথম কোনো করপোরেট প্রধানের নাম আসায় বিষয়টি আরও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মনোনয়ন মোটেও বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গত কয়েক দশকে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ ক্রমেই বেড়েছে। অর্থসংকটে থাকা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এখন বেসরকারি খাত ও দাতব্য সংস্থার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠান মানবিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের ব্র্যান্ড ইমেজও শক্তিশালী করছে।
ইউএনএইচসিআর বর্তমানে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে। একই সময়ে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় অভিবাসন ও শরণার্থীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ ও জনমতও বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে সুইডেনের মতো দেশ হয়তো নিজেদের মানবিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
তবে সমালোচনার জায়গাও কম নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউএনএইচসিআর একদিকে উন্নত দেশগুলোর রাজনৈতিক চাপ, অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর শরণার্থী আশ্রয়ের বাস্তবতার মধ্যে আটকে আছে। করপোরেট ব্যবস্থাপনার ‘সহানুভূতিশীল পুঁজিবাদ’ এই কাঠামোগত দ্বন্দ্ব মেটাতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এ ছাড়া শরণার্থীদের শ্রম ও দক্ষতাকে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার ধারণাও প্রশ্নবিদ্ধ। অতীতে আইকিয়ার এমন উদ্যোগ সীমিত পরিসরেই বাস্তবায়িত হয়েছে এবং অনেক দেশে শরণার্থীরা এখনও কাজ ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় বাধার মুখে।
আরেকটি বিতর্কের বিষয় হলো আইকিয়ার করপোরেট কাঠামো ও করব্যবস্থা। ইউরোপীয় ইউনিয়নে কর সুবিধা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আগেও তদন্ত হয়েছে। সমালোচকদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোয় বড় ব্যবসার ভূমিকা অনেক সময়ই সেই বৈষম্য তৈরি করে, যা পরে মানবিক সংকট বাড়িয়ে তোলে।
পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা, করপোরেট যুক্তির প্রভাব বাড়লে ইউএনএইচসিআরের মূল সুরক্ষা ম্যান্ডেট দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। শরণার্থী সুরক্ষা তখন মানবিক অধিকার নয়, বরং দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রশ্নে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
এই কারণেই বিশ্লেষকেরা বলছেন, জেসপার ব্রোডিনের সম্ভাব্য নিয়োগ শুধু একজন ব্যক্তির বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক শরণার্থী ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
















