যুদ্ধ শেষ হওয়ার তিন দশক পরও বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা আজও বহন করছে ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সালের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের গভীর ক্ষত। জাতিগত নিধন, ব্যাপক সহিংসতা ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির সেই অধ্যায়ে প্রাণ হারান প্রায় এক লাখ মানুষ, আর ঘরছাড়া হন দুই কোটিরও বেশি নাগরিক।
সাবেক যুগোস্লাভিয়া ভাঙনের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট এই যুদ্ধ ছিল জাতিগত উত্তেজনা ও চরম জাতীয়তাবাদের ফল। যুদ্ধের চূড়ান্ত ও সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায় ছিল ১৯৯৫ সালের স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃত।
যুদ্ধের সূচনা ও পটভূমি
বসনিয়া ছিল সমাজতান্ত্রিক ফেডারেল রিপাবলিক অব যুগোস্লাভিয়ার ছয়টি প্রজাতন্ত্রের একটি। দীর্ঘদিন প্রেসিডেন্ট যোসিপ ব্রোজ টিটোর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ থাকলেও ১৯৮০ সালে তাঁর মৃত্যুর পর অর্থনৈতিক সংকট ও জাতীয়তাবাদের উত্থানে দেশটি ভাঙনের পথে যায়। ১৯৯১ সালে স্লোভেনিয়া ও ক্রোয়েশিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
১৯৯২ সালের ১ মার্চ বসনিয়ায় স্বাধীনতা প্রশ্নে গণভোট হয়, যেখানে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা স্বাধীনতার পক্ষে মত দেয়। তবে বসনীয় সার্বরা ভোট বর্জন করে আলাদা রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তোলে, যা পরে রিপাবলিকা স্রপস্কা নামে পরিচিত হয়। একই সময়ে সার্বিয়ার নেতা স্লোবোদান মিলোসেভিচের নেতৃত্বে বৃহত্তর সার্ব রাষ্ট্র গঠনের প্রচেষ্টা সংঘাতকে আরও উসকে দেয়।
১৯৯২ সালের এপ্রিল মাসে ইউরোপীয় কমিউনিটি বসনিয়াকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলে বসনীয় সার্ব বাহিনী যুগোস্লাভ সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন আধাসামরিক গোষ্ঠীর সহায়তায় দেশজুড়ে আক্রমণ শুরু করে। এরই অংশ হিসেবে সারায়েভো শহর দীর্ঘ প্রায় ৪৩ মাস অবরুদ্ধ থাকে, যা আধুনিক ইউরোপের দীর্ঘতম অবরোধ হিসেবে পরিচিত। এই অবরোধে প্রায় ১১ হাজার মানুষ নিহত হন।
নিহত ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা
যুদ্ধ-পরবর্তী গবেষণা অনুযায়ী, এই সংঘাতে নিহত হন আনুমানিক ১ লাখ ৪ হাজার মানুষ, যাদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক এবং এর মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ছিলেন বসনীয় মুসলমান। একই সময়ে দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ, অর্থাৎ প্রায় ২২ লাখ মানুষ, শরণার্থী বা অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতিতে পরিণত হন। তাদের বড় অংশ আর কখনো নিজ বাড়িতে ফিরতে পারেননি।
গণহত্যার পথে ভয়াবহ অপরাধসমূহ
যুদ্ধের শুরু থেকেই বসনীয় মুসলমানদের লক্ষ্য করে পরিকল্পিত জাতিগত নিধন চালানো হয়। প্রিজেদর অঞ্চলে ওমারস্কা, কেরাতার্ম ও ত্রনোপোলিয়ে নামের বন্দিশিবিরে হাজারো মানুষকে নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়। পূর্ব বসনিয়ার ফোচা ও ভিশেগ্রাদ এলাকায় নারীদের ওপর সংঘবদ্ধ ধর্ষণ চালানো হয়, যা পরে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আন্তর্জাতিক আদালতে স্বীকৃত হয়।
১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ স্রেব্রেনিৎসাসহ কয়েকটি এলাকাকে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ ঘোষণা করলেও সহিংসতা থামেনি। আহমিচি গ্রামে ক্রোয়াট বাহিনীর হাতে শতাধিক বসনীয় মুসলমান নিহত হন। সারায়েভোতে মার্কালে বাজারে মর্টার হামলায় বহু বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারান, যা আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের চাপ বাড়ায়।
স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা
১৯৯৫ সালে স্রেব্রেনিৎসা এলাকায় হাজারো বসনীয় মুসলমান আশ্রয় নিয়েছিলেন। যদিও সেখানে জাতিসংঘের ডাচ শান্তিরক্ষী মোতায়েন ছিল, তবুও বসনীয় সার্ব বাহিনী জুলাই মাসে শহরটি দখল করে। এরপর কয়েক দিনের মধ্যে নারী ও শিশুদের আলাদা করে অন্তত আট হাজার মুসলিম পুরুষ ও কিশোরকে হত্যা করা হয় এবং গণকবরে পুঁতে ফেলা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালত এই ঘটনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গণহত্যা হিসেবে রায় দেয়।
যুদ্ধের অবসান ও ডেটন চুক্তি
স্রেব্রেনিৎসা হত্যাকাণ্ডের পর পশ্চিমা দেশগুলো নড়েচড়ে বসে। ১৯৯৫ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ন্যাটোর বিমান হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ডেটন শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে একক রাষ্ট্র হিসেবে রেখে দুটি প্রধান প্রশাসনিক অংশে ভাগ করা হয়।
বিচার ও জবাবদিহি
১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। ২৪ বছরের কার্যক্রমে ১৬১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে অনেককে দোষী সাব্যস্ত করে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বসনীয় সার্ব নেতা রাদোভান কারাদজিচ ও সেনাপ্রধান রাতকো ম্লাদিচ দুজনেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। তবে বহু ভুক্তভোগীর মতে, ন্যায়বিচার এখনও অসম্পূর্ণ।
তিন দশক পরও বসনিয়ার যুদ্ধ স্মরণ করিয়ে দেয়, জাতিগত ঘৃণা ও রাজনৈতিক চরমপন্থা কীভাবে একটি সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। এই ইতিহাস আজও ইউরোপ ও বিশ্বের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা।















