শীত নামলেই দিল্লির আকাশ যেন ধোঁয়ার চাদরে ঢেকে যায়। দীপাবলির বাজি, শীতের স্থির বাতাস, খড় পোড়ানো, যানজট আর শিল্পকারখানার ধোঁয়া মিলে রাজধানীর বুকে নেমে আসে বিষাক্ত কুয়াশা। এ বছরের শুরুর ডিসেম্বরেও বহু এলাকায় এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স ছুঁয়েছে ৪০০ থেকে ৪৫০– যা বিশ্বমান অনুযায়ী ‘গুরুতর’ দূষণ।
ভারতের অনেক শহর যখন দূষণের বোঝা বইছে, তখন প্রতিবেশী চীন যেন এক বাস্তব উদাহরণ। বেইজিং একসময় ছিল বিশ্বের ‘স্মগ রাজধানী’। দুই দশক আগে সেখানে শ্বাস নেয়াই ছিল দুঃসাহস। কিন্তু কঠোর নীতি, নির্ভুল বাস্তবায়ন আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় চীন দেখিয়েছে—ইচ্ছা ও উদ্যোগ থাকলে দূষণের অন্ধকার ভেদ করে নীল আকাশ ফিরিয়ে আনা অসম্ভব নয়।
২০০৮ অলিম্পিকের আগে সাময়িক নির্গমন নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বেইজিংয়ের দূষণবিরোধী লড়াই। পরে ২০১৩ সালে পাঁচ বছরের জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করে চীন আরও বড় যুদ্ধের ডাক দেয়। কয়লা-চালিত বয়লার বন্ধ, গণপরিবহন বাড়ানো, নতুন শক্তিচালিত যানবাহন উৎসাহিত করা, শিল্পপ্রযুক্তিতে রূপান্তর—এ যেন ভবিষ্যৎ বাঁচানোর এক বিশাল অভিযান।
বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল ক্ষুদ্র কণা PM2.5 কমানোর দিকে। এই অদৃশ্য কণা ফুসফুস ভেদ করে রক্তে পৌঁছায়, নিঃশব্দে ক্ষয় করে মানুষের জীবন। তাই এক দশক ধরে চীন এই মারাত্মক দূষণের মূলেই আঘাত হানে।
পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, কারখানা স্থানান্তর, কৃষিক্ষেত্রে দাহ নিষেধে প্রণোদনা—সব মিলিয়ে ২০১7 সালের মধ্যেই দূষণপ্রবণ এলাকাগুলোতে দেখা দেয় ৩৫ শতাংশ উন্নতি। ২০১৩ সালে যেখানে PM2.5 ছিল ৭২ মাইক্রোগ্রাম, তা ২০১৯ সালে নেমে আসে অর্ধেকে, আর ২০২৪ সালে আরও কমে দাঁড়ায় ২৯.৩ মাইক্রোগ্রাম। যদিও এখনো WHO–এর মানদণ্ডের ওপরে, তবুও এটি ছিল বিশাল সাফল্য।
করোনার কঠিন সময়েও চীন থামেনি। নির্মাণক্ষেত্রের নির্গমন নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার, পুরোনো যানবাহন বাদ দেওয়া, ইভি–ব্যবহারে উৎসাহ—সব মিলিয়ে রাজধানী বেইজিং আজ পরিণত হয়েছে দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিশ্বমানের একটি উদাহরণে। ২০২৫ সালের প্রথম তিন প্রান্তিকে শহরটিতে PM2.5–এর গড় মাত্রা নেমে এসেছে ২৪.৯ মাইক্রোগ্রামে।
দেশজুড়ে পরিবর্তনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২২ সালে চীনে গড় PM2.5 ছিল ২৯ মাইক্রোগ্রাম, আর ৩৩৯টি শহরের মধ্যে ৩১৬ দিন ছিল স্বচ্ছ আকাশ। বিশ্বে যেখানে দূষণ বাড়ছে, সেখানে চীনের সাফল্য বৈশ্বিক দূষণও কমিয়েছে—এ যেন এক দেশের প্রচেষ্টায় পৃথিবীর বুকে কিছুটা হলেও স্বস্তির বাতাস।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১৫ থেকে ২০২৩—এই সময়ে বেইজিং-তিয়ানজিন-হেবেই অঞ্চলে PM2.5 কমেছে ৪৪.২ শতাংশ, সালফার ডাই–অক্সাইড ৭৬.৩ শতাংশ, নাইট্রোজেন ডাই–অক্সাইড ৩৪.৮ শতাংশ। শিল্প, কৃষি, পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই এসেছে পরিবর্তন। নবায়নযোগ্য শক্তি ও ইভি–নির্ভর শিল্পে চীন আজ বিশ্বের নেতা।
অর্থনীতিও থেমে থাকেনি। ২০১৩ থেকে ২০২৪—মাঝেই চীনের জিডিপি বেড়েছে ৭৩ শতাংশের বেশি, অথচ দূষণ কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। চীনের এই পথচলা দেখায়—উন্নয়ন ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ পাশাপাশি চলতে পারে।
তবুও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। ২০২৪ সালে তিন-চতুর্থাংশ শহর লক্ষ্য অর্জন করলেও কিছু অঞ্চলে দূষণ আবার মাথা তুলছে। তাই আরও কঠোর বাস্তবায়ন জরুরি।
এই অভিজ্ঞতা ভারতসহ দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার ক্ষেত্র। দ্রুত নগরায়ন, শিল্পায়ন আর জনসংখ্যার চাপ—ভারত এখন সেই অবস্থানেই দাঁড়িয়ে, যেখান থেকে এক দশক আগে সামনে পথ খুঁজছিল চীন।
চীনের নীল আকাশ ফেরানোর পথ থেকে অনুসরণীয় বিষয়গুলো হতে পারে—
দূষণকারী কারখানা বন্ধ করা
বৈদ্যুতিক বাস ও পরিবহন বাড়ানো
নির্মাণক্ষেত্রে রিয়েল-টাইম ধুলা পর্যবেক্ষণ
প্রদেশ-উপপ্রদেশের সমন্বিত নীতি বাস্তবায়ন
চাই শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর বাস্তবায়ন।
পরিবেশের সীমানা নেই। দূষণও সীমান্ত মানে না। তাই সময় এসেছে একসঙ্গে শেখার, একসঙ্গে কাজ করার। নয়াদিল্লির আকাশ যদি আবার নীল হতে চায়, তবে বেইজিংয়ের পথচলা তার জন্য এক মূল্যবান দিশা হয়ে উঠতে পারে।
















