৬ অক্টোবর ২০২৫
বিশ্ববাজারে খাদ্যদ্রব্যের দাম টানা কয়েক মাস ধরে কমছে। কিন্তু বাংলাদেশের বাজারে তার উল্টো চিত্র—চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস থেকে শুরু করে শাকসবজি পর্যন্ত সবকিছুর দাম বেড়েই চলছে। এতে ইতিমধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছে সাধারণ মানুষ।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য সূচক নেমে এসেছে ১২৮.৮ পয়েন্টে, যা আগস্টের ১২৯.৭ পয়েন্ট থেকে সামান্য কম। আন্তর্জাতিক বাজারে চিনি, দুগ্ধজাত দ্রব্য, গম ও চালের দাম কমেছে। কিন্তু বাংলাদেশের বাজারে তার কোনো প্রভাব পড়েনি—যা ঘরোয়া বাজার ব্যবস্থাপনার অদক্ষতাকেই প্রকাশ করে।
গ্লোবাল দামে স্বস্তি, লোকাল বাজারে উল্টো চাপ অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি এক ধরনের বৈপরীত্য—বিশ্বব্যাপী দাম কমছে, অথচ বাংলাদেশে বাড়ছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)–এর বিশিষ্ট ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,
“আমদানি করা পণ্য দেশে ঢোকার পর থেকেই মধ্যস্বত্বভোগীরা বাজার দখল করে ফেলে। ফলে বাজার নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায় অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা, বৈশ্বিক প্রবণতা নয়।”
তার মতে, আন্তর্জাতিক দামের পতন মুদ্রাস্ফীতির চাপ কিছুটা লাঘব করতে পারে, কিন্তু ভোক্তা ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো স্বস্তি পাবে না, যতক্ষণ না সরকার বাজার তদারকি ও স্বচ্ছতা জোরদার করছে।
“যদি নীতিনির্ধারকেরা বাজার মনিটরিং ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে পারেন, তাহলেই সাধারণ মানুষ প্রকৃত অর্থে সেই সুফল পাবে,” তিনি বলেন।
এদিকে, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয়ের উচ্চতা স্থানীয় বাজারে দামের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এ খাতে ব্যয় কমানো গেলে পুরো সরবরাহব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিশ্ববাজারে চিত্র:
চিনির দাম কমছে, মাংসে চাহিদা বাড়ছে FAO’র তথ্যমতে, সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্ববাজারে চিনির দাম ৪.১ শতাংশ কমেছে, যা ২০২১ সালের পর সর্বনিম্ন। ব্রাজিল, ভারত ও থাইল্যান্ডে ভালো উৎপাদন ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে সরবরাহ বেড়েছে। দুগ্ধজাত পণ্য–এর দামও ২.৬ শতাংশ কমেছে, বিশেষ করে বাটারের দাম হ্রাস পাওয়ায়।
অন্যদিকে, গম, ভুট্টা ও চালের দাম কমেছে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রে গরু ও ভেড়ার মাংসের দাম বেড়েছে, কারণ চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু সরবরাহ সীমিত ছিল।
FAO আরও জানায়,
২০২৫ সালে বৈশ্বিক শস্য উৎপাদন ২.৯৭১ বিলিয়ন মেট্রিক টনে পৌঁছাতে পারে, যা গত বছরের তুলনায় ৩.৮ শতাংশ বেশি — ২০১৩ সালের পর সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। বিশ্বে এটি স্থিতিশীলতার বার্তা দিলেও, বাংলাদেশের জন্য এটি “সংযোগ বিচ্ছিন্নতার” প্রতীক।
বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা কমলেও খাদ্যের আগুন জ্বলছেই বাংলাদেশে সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতি আগস্টে নেমে এসেছে ৮.২৯ শতাংশে—যা ৩৭ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। কিন্তু খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই হার ৭ শতাংশের নিচে নামানোর আশা করেছিল, কিন্তু ঋতুভিত্তিক ও উৎসবকালীন প্রভাব—বিশেষ করে দুর্গাপূজার সময় সীমান্ত বাণিজ্য ব্যাহত হওয়া ও মৌসুমি সরবরাহ ঘাটতি—বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (TCB)–এর তথ্য অনুযায়ী:

- ফাইন চাল এখন ৭৫–৮৫ টাকা কেজি (গত বছর ৬৪–৮০ টাকা)
- ডাল ১৫০–১৬০ টাকা কেজি (আগে ছিল ১২৫–১৩৫ টাকা)
- খোলা সয়াবিন তেল ১৭০–১৭৮ টাকা লিটার, বোতলজাত তেল ১৮৮–১৯০ টাকা, ৫ লিটারের বোতল ৯০০ টাকার বেশি
- মাছ ও মাংসের দাম: হিলসা মাছ এখন প্রতি কেজি ১,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকা, রুই/কাতলা ৩০০–৫০০ টাকা, খাসির মাংস ১,০০০–১,২০০ টাকা, আর গরুর মাংস প্রায় ৭৫০ টাকা কেজি।
- সবজির বাজারেও আগুন: কাঁচামরিচ ৩০০–৩৫০ টাকা, বেগুন ২২০, টমেটো ১৪০, বরবটি ১০০, চওড়া বরবটি একসময় ২৪০ পর্যন্ত উঠেছিল, এখন নেমেছে ১৬০ টাকায়।
দোষ কার? ব্যবসায়ী, বৃষ্টি না বাজার তদারকির দুর্বলতা? বিক্রেতারা বলছেন, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে দুর্গাপূজার সময় বাণিজ্য বন্ধ থাকার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। কিন্তু ভোক্তাদের মতে, মূল কারণ সিন্ডিকেট ও দুর্বল সরকারি নজরদারি।
কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (CAB)–এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এস. এম. নাজের হোসেন বলেন,
“আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশীয় বাজারে দাম সমন্বয় হচ্ছে না। দাম বাড়লে সরকার দ্রুত শুল্ক কমায়, কিন্তু দাম কমলে সেই সুবিধা আর ভোক্তারা পায় না। ব্যবসায়ীরাই লাভ তুলে নেয়।”
কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ ও নীতি বিশ্লেষণ বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশের বাজারের এই বৈষম্য মূলত আঞ্চলিক অদক্ষতা ও কাঠামোগত দুর্বলতার ফল। এক ইউরোপীয় বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ বলেন —
“বাংলাদেশের খাদ্যবাজারে এ অস্থিরতা গ্লোবাল প্রবণতার চেয়ে স্থানীয় জটিলতার প্রতিফলন। যদি ঢাকা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সরবরাহ নেটওয়ার্কের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত হয় এবং আমদানি শুল্কে স্বচ্ছতা আনে, তাহলে বাজার দ্রুত স্থিতিশীল হবে।”
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও উন্মুক্ত বাণিজ্যপথই হতে পারে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
বিশ্বে স্বস্তি, দেশে অস্থিরতা বিশ্ববাজারে যখন খাদ্যদ্রব্যের দাম স্থিতিশীল, তখন বাংলাদেশ এক ব্যতিক্রম—যেখানে দুর্বল তদারকি, শক্তিশালী মধ্যস্বত্বভোগী, আর জ্বালানি ব্যয়ের চাপ বিশ্বব্যাপী স্বস্তির সুফল মুছে দিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের বার্তা পরিষ্কার:
“যতক্ষণ না বাজার মনিটরিং, জ্বালানি খরচ ও বাণিজ্য স্বচ্ছতায় বড় সংস্কার আনা যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারের স্বস্তি বাংলাদেশের ঘরে পৌঁছাবে না।”
বাংলাদেশের খাদ্যবাজারের অস্থিরতা মূলত বৈশ্বিক নয়, বরং দেশীয় কাঠামোগত দুর্বলতা ও বাজার ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন। যদি ঢাকা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সরবরাহ চেইনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে পারে এবং আমদানি শুল্ক ও বাণিজ্য প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে, তবে দেশীয় বাজার দ্রুত স্থিতিশীল হতে পারে।
















