কিয়েভ, ইউক্রেন – সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে টানানো কাঁটাতারের উপর দিয়ে দুইবার পালানোর সময় হাতজুড়ে যে বেগুনি দাগ পড়েছে, ৩৬ বছর বয়সী টাইমোফেই এখনও তা বহন করছেন। রাজধানী কিয়েভের এই দীর্ঘদেহী অফিসকর্মী জানান, গত এপ্রিল মাসে জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে তোলা হয়েছিল তাঁকে, আর অকার্যকর ও বাস্তব যুদ্ধের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রশিক্ষণ দেখে তিনি পালানোর সিদ্ধান্ত নেন।
টাইমোফেই আল জাজিরাকে বলেন, “এখানে কোনো প্রশিক্ষণই নেই। তারা পরোয়া করে না আমি প্রথম আক্রমণেই মারা যাব কি না।” তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশিক্ষকেরা আসল প্রশিক্ষণের চেয়ে বেশি মনোযোগ দিতেন যাতে কেউ পালাতে না পারে। তিন মিটার উঁচু দেয়াল আর কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা ছিল কেন্দ্রটি।
তিনি বলেন, একটি রাইফেল হাতে দিয়ে একটি গুলি ছুড়তেই নামের পাশে টিক চিহ্ন দেওয়া হয়েছে। তিনি নিজের পরিচয় গোপন রাখতে বলেছেন কারণ এখনো কর্তৃপক্ষের কাছে লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে তাঁকে।
অভিযোগের সরকারি রেকর্ড দেখেও তিনি নিশ্চিত হয়েছেন—তাঁর বিরুদ্ধে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পলাতক বা অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ আনা হয়নি। ব্যাখ্যা হিসেবে তিনি বলেন, “দেশের অর্ধেক মানুষই পালিয়ে বেড়াচ্ছে”, আর কর্তৃপক্ষ সবার খোঁজ রাখার সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে।
ইউক্রেনীয় প্রসিকিউটররা অক্টোবর মাসে জানান, রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার সৈন্য অনুমতি ছাড়া ইউনিট ছেড়েছে এবং কমপক্ষে ৫৪ হাজার আনুষ্ঠানিকভাবে পলায়ন করেছে। শুধুমাত্র গত বছরেই ১ লাখ ৭৬ হাজার অননুমোদিত অনুপস্থিতি এবং ২৫ হাজার পলায়নের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
ইউক্রেনের স্টর্ম ট্রুপসের কমান্ডার ভ্যালেন্টিন মানকো বলেন, “রাশিয়াতেও এত সৈন্য পলায়ন করে না।”
সেনা সংকটের ফলে রাশিয়ার ক্রমাগত অগ্রগতির মুখে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। গত নভেম্বর মাসেই রুশ বাহিনী ৫০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করে, আর যুক্তরাষ্ট্র-মধ্যস্থ শান্তি আলোচনা আবারও থমকে যায়।
মানকো জানান, প্রতি মাসে ৩০ হাজার লোককে সেনাবাহিনীতে তোলা হচ্ছে, কিন্তু প্রয়োজন অন্তত ৭০ হাজার—সমস্ত ইউনিট পুনর্গঠনের জন্য।
সামরিক নিয়ম অনুযায়ী, ইউনিট ছেড়ে ২৪ ঘণ্টা পরই কোনো সদস্যকে পলায়নকারী হিসেবে গণ্য করা যায় এবং এর শাস্তি পাঁচ থেকে ১২ বছর কারাদণ্ড। অননুমোদিতভাবে ইউনিট ত্যাগ করলে শাস্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর।
অনেকে মনে করেন, ফ্রন্টলাইনে যাওয়ার চেয়ে জেলে যাওয়া সহজ।
ইউক্রেনীয় সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক উপপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইগর রোমানেঙ্কো বলেন, “অনেকের ধারণা আইনগতভাবে জেলে যাওয়া ফ্রন্টলাইনে যাওয়ার চেয়ে সহজ।” তিনি কঠোর সামরিক আইন ও দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তাদেরও ফ্রন্টলাইনে পাঠানোর দাবি জানান।
গত বছর থেকে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সরকার প্রথমবার পলায়নকারীদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছে। প্রায় ৩০ হাজার সৈন্য এই সুযোগে ফিরে এসেছে। দক্ষিণ ইউক্রেনের একটি ইউনিটের মনোবিজ্ঞানী জানান, সমস্যার মূল কারণ সবসময় যুদ্ধভীতি নয়—অনেক ক্ষেত্রেই কমান্ডারদের উদাসীন আচরণ সৈন্যদের পলায়নে উৎসাহিত করে।
এদিকে সামরিক পুলিশফোর্স জনবল সংকটে ভুগছে, আর আদালত হাজারো মামলায় এতটাই ব্যস্ত যে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই সেনাপ্রার্থীদের সবচেয়ে বড় ভয়ের জায়গা হলো “কনস্ক্রিপশন প্যাট্রোল” যারা জনসমাগমস্থলে পরিচয়পত্র পরীক্ষা করে। তবে অনেক পলাতকই এড়িয়ে চলার কৌশল জানে, কিংবা ঘুষ দিতে প্রস্তুত থাকে।
টাইমোফেইও ধরা পড়েছিলেন গাড়ির জরিমানা নিজের ব্যাংক কার্ড থেকে পরিশোধ করায়। সেখান থেকে তাঁর অবস্থানের সন্ধান পায় পুলিশ। প্রথমবার পালানোর পর তিনি কিয়েভে ফিরে কাজে যোগ দেন, কিন্তু দুই মাসের মাথায় আবার গ্রেপ্তার হন এবং দ্রুতই দ্বিতীয়বার পালিয়ে যান।
বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়দের অনেকে তাকে কাপুরুষ বলে বন্ধুত্ব ছিন্ন করেছেন। অনেক সাবেক সৈন্য মনে করেন, পলাতকদের কঠোর শাস্তি দেওয়া উচিত এবং তাদের নাগরিক অধিকার সীমিত করা উচিত। ২০২৩ সালে বাখমুতের কাছে ডান চোখ হারানো ইভহেন গালাসিয়ুক বলেন, “তাদের ভোট দেওয়া বা পেনশন পাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।”















