মার্কিন ও ইউরোপের দূর–ডানপন্থী প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, ভুয়া বিশ্লেষক, প্রো–ইসরায়েল থিংক ট্যাংক এবং ইসলামবিরোধী প্রচারকরা সম্প্রতি কাতারকে ঘিরে এক ধরনের ষড়যন্ত্রবাদী প্রচারণা চালাচ্ছেন। তাদের বয়ানে কাতারকে তুলে ধরা হচ্ছে পশ্চিমা সভ্যতার পতনের নেপথ্য কারিগর হিসেবে—যেন বিশ্বজুড়ে ছাত্র আন্দোলন, অভিবাসন বৃদ্ধি, মার্কিন কূটনীতি, এমনকি পশ্চিমা সমাজের “ইসলামাইজেশন”–এর পেছনেও কাতারের হাত আছে।
এই প্রচারণার সবচেয়ে পরিষ্কার উদাহরণ দেখা যায় মার্কিন প্রভাবক লরা লুমার এবং ব্রিটিশ ইসলামবিরোধী কর্মী টমি রবিনসনের কর্মকাণ্ডে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সমর্থক লুমার হঠাৎ করেই “কাতার অনুপ্রবেশ” বিষয়ে নিজেকে বিশেষজ্ঞ হিসেবে তুলে ধরছেন। ২০২৫ সাল থেকে তিনি প্রায় প্রতিদিন কাতার নিয়ে পোস্ট করছেন। তাঁর দাবি, কাতার যুক্তরাষ্ট্রে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার থেকে শুরু করে অ্যান্টিফা, এমনকি বিভিন্ন মুসলিম সংগঠন পর্যন্ত সবকিছুই অর্থায়ন করছে।
অন্যদিকে রবিনসন সম্প্রতি “ফাক কাতার” শিরোনামে প্রচারণা চালাচ্ছেন। লন্ডনে ধারণ করা একটি ভিডিওতে তিনি দাবি করেন, কাতার যুক্তরাজ্যের অবকাঠামো ও সমাজকে “ধ্বংসের পথে” নিয়ে যাচ্ছে।
এই প্রচারণা হঠাৎ তৈরি হয়নি। এটি ইসলামোফোবিয়া উসকে দেওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ, যার মাধ্যমে গাজায় কাতারের মধ্যস্থতার ভূমিকা দুর্বল করা, ওয়াশিংটনের সঙ্গে দোহার সম্পর্ক নষ্ট করা, এবং পুরোনো “ইউরাবিয়া” ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে নতুনভাবে ব্যবহারের চেষ্টা চলছে।
ষড়যন্ত্রের পুরোনো ছকে নতুন রূপ
এই বয়ানের মূল ভিত্তি দুটি পুরোনো বিবরণ—“রেড–গ্রিন জোট” (বামপন্থী ও ইসলামপন্থীদের কাল্পনিক জোট) এবং “ইউরাবিয়া” তত্ত্ব, যেখানে বলা হয় ইউরোপীয় নেতারা নাকি মুসলিম অভিবাসনের মাধ্যমে ইসলামপন্থীদের হাতে ইউরোপ তুলে দিচ্ছেন।
এখন এই তত্ত্ব নতুন রূপে হাজির—যেন কাতার পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলিম ব্রাদারহুডের মাধ্যমে ইসলামপন্থা ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এতে মুসলমানরা হয়ে উঠছে পশ্চিমা সভ্যতার প্রতি “বড় হুমকি”, যা অতীতের ইহুদিবিদ্বেষী “গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট” ষড়যন্ত্রেরই নতুন সংস্করণ।
অর্থায়নের জটিল কাঠামো
এই প্রচারণার পেছনে অর্থায়ন নিয়েও রয়েছে নানা অস্বচ্ছতা। লুমার ও রবিনসন দুজনই অতীতে মার্কিন ধনকুবের রবার্ট শিলম্যানের অর্থসাহায্য পেয়েছেন, যিনি কট্টর ইসরায়েলপন্থী সংগঠন ও ইসলামবিরোধী প্রচারণায় অর্থ ঢেলে থাকেন। রবিনসনকে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কয়েকটি প্রো–ইসরায়েল থিংক ট্যাংকও সহায়তা করেছে বলে জানা যায়।
২০২৪ সালে ইসরায়েলি প্রবাসী বিষয়ক মন্ত্রণালয় যে একটি ইসলামবিরোধী প্রচারণা চালিয়েছিল, সেটিও উত্তর আমেরিকা লক্ষ্য করে তৈরি হয়েছিল। সেই মন্ত্রণালয়ের প্রধান আমিচাই চিকলি সম্প্রতি লুমার ও রবিনসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেই সাক্ষাতের পর থেকেই তাদের কাতারবিরোধী পোস্ট হঠাৎ বেড়ে গেছে।
২০২৩–২৪ সালে এক অজ্ঞাত উৎস থেকে কোটি কোটি ডলার ব্যয়ে “কাতার ইউরোপ ধ্বংস করছে”—এমন প্রচারণা চালানো হয়েছিল, যার ভিডিও এখনো ইউটিউব ও ফেসবুকে লাখো–কোটি ভিউ পাচ্ছে।
কেন কাতারকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে
দূর–ডানপন্থীদের কাছে কাতার একটি সুবিধাজনক প্রতীক—ইসলামফোবিয়া, অভিবাসনবিরোধী রাজনীতি ও “সভ্যতা রক্ষার” বয়ানকে শক্তিশালী করার জন্য আদর্শ লক্ষ্যবস্তু।
ইসরায়েলের জন্য কাতারকে দুর্বল করা মানে হামাসের সঙ্গে মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া দুর্বল করা। মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশও কাতারের আঞ্চলিক প্রভাব সীমিত করতে এমন প্রচারণাকে সমর্থন করে।
মার্কিন রাজনীতিতে কাতারকে চিহ্নিত করা হচ্ছে ছাত্র আন্দোলন, প্রগতিশীল রাজনীতি এবং এমনকি রিপাবলিকান ভিন্নমতাবলম্বীদেরও নেপথ্য “ষড়যন্ত্রী” হিসেবে।
বাস্তবতা
কোনো দেশের মতো কাতারের নীতিও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। তবে দোহাকে একটি বৈশ্বিক ইসলামপন্থী চক্রান্তের কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরা কেবলই ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্র—যা যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান রাজনীতির মধ্যে ক্রমবর্ধমানভাবে প্রভাব বিস্তারকারী গোষ্ঠীগুলোর কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
এই প্রচারণা শেষ পর্যন্ত ইসলামভীতিকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার আরেকটি নতুন সংস্করণ ছাড়া কিছুই নয়।
















